ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধকালে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখায় সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রসাধনী জায়ান্ট অ্যাভন। দেশটিতে নতুন বিক্রয় এজেন্ট নিয়োগের পাশাপাশি মস্কো অঞ্চলে বিশাল কারখানায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। খবর বিবিসি।
অ্যাভনের সদর দপ্তর যুক্তরাজ্যে। প্রতিষ্ঠানটি ৩০ বছর ধরে রাশিয়ায় ব্যবসা করে আসছে। সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাবে তারা বলছে, অনেক নারী জীবিকার জন্য অ্যাভনের ওপর নির্ভরশীল। সেদিকে সংস্থার মনোযোগ বেশি।
১৩৭ বছর বয়সী এ কসমেটিকস জায়ান্টের বিক্রি নীতিও আলাদা। তারা বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রসাধনী ও পারফিউম ক্রেতাদের দরজায় পৌঁছে দেয়। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দোকান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিক্রয়ের ওপর মনোযোগ দিয়েছে।
ইউক্রেনের হামলার পর পশ্চিমা অনেক প্রতিষ্ঠানই মস্কো ছেড়ে গেছে। ওই সময় অ্যাভনও ঘোষণা করেছিল, তারা রাশিয়ায় বিনিয়োগ বন্ধ করবে। রাশিয়ার কারখানা থেকে ইউক্রেনসহ অন্যান্য বাজারে সৌন্দর্য সামগ্রীর রফতানি স্থগিত করবে।
অ্যাভনের মূল কোম্পানি ব্রাজিলিয়ান সংস্থা নেচুরা অ্যান্ড কোম্পানি জোর দিয়ে বলেছিল, শুধু নির্ভরশীল বিক্রয় প্রতিনিধিদের সাহায্য করার জন্য স্থানীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনও বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি যে পণ্যগুলোর বাজারে প্রবেশ সীমিত করলে নির্ভরশীল নারী ও শিশুদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
বিবিসির অনুসন্ধানে জানা যায়, রাশিয়ায় নতুন বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে চলেছে অ্যাভন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কর্মীদের সামনে রয়েছে পুরস্কার, নগদ বোনাস ও ছুটির মতো লোভনীয় প্রস্তাব। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও অ্যাভন রাশিয়া খুবই সক্রিয়। বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগের জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করেন বিবিসিসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি। এরপর অ্যাভনের পক্ষ থেকে ইমেইল পান তিনি। যেখানে স্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো কী করেছে তা অনুসরণ করছে যুক্তরাজ্যের ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। তাদের একজন স্টিভেন তিয়ান বলেন, ‘রাশিয়ায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাভনের লজ্জিত হওয়া উচিত। ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ মেশিনে অর্থায়ন চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো অজুহাত নেই।’
এ ঘটনায় রাশিয়ার ওপর উষ্মা প্রকাশ করেছে মোরাল রেটিং এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা মার্ক ডিক্সন। অ্যাভনের কার্যক্রমকে ইউক্রেনে নিষিদ্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ডিক্সন বলেন, ‘পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের অর্থনীতিকে সমর্থন করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে নারী ও শিশুদের জন্য পণ্য বিক্রি করতে পারে?’
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়ায় কার্যক্রম চালু করে অ্যাভন। এরপর দ্রুত ওই বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করে নেয়। অ্যাভনের রাশিয়ার ওয়েবসাইট অনুসারে, এটি দেশের ১ নম্বর পারফিউম ব্র্যান্ড। ২০০৪ সালে এ প্রসাধন জায়ান্ট মস্কোয় কারখানা খোলে, যেখানে ২২০টির বেশি ধরনের প্রসাধনী ও পারফিউম উৎপাদন হচ্ছে। কারখানা খোলার পর থেকে সেখানে ২৫০ কোটির বেশি ইউনিট পণ্য উৎপাদন হয়েছে।
এদিকে অ্যাভন বলছে, মস্কোর কারখানাটি একচেটিয়াভাবে রুশ বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করে। ইউক্রেনের যুদ্ধের শুরুতে কোম্পানিটি ইন্টারফ্যাক্স নিউজ এজেন্সিকে বলেছিল, পূর্ব ইউরোপীয় বাজারের জন্য নারো-ফোমিনস্ক থেকে পোল্যান্ডে উৎপাদন স্থানান্তরের দিকে নজর দিচ্ছে তারা। বিবিসি জানায়, অর্ডারের মাধ্যমে তারা পোল্যান্ডে উৎপাদিত কিছু পণ্য পেয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বশেষ হালনাগাদে নেচুরা অ্যান্ড কোম্পানি জানায়, গত নভেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকে অ্যাভন ইন্টারন্যাশনালের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ২৭ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড হয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে যুদ্ধ ও নতুন ব্যবসায়িক মডেলের কারণে বিক্রয় প্রতিনিধি কমাতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে।
ডেভিড ম্যাককনেলের হাত ধরে ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যাভন। নিউইয়র্কের ছোট একটি কক্ষে সুগন্ধি নিয়ে পরীক্ষা চালাতেন তিনি। ২০২০ সালে অ্যাভন অধিগ্রহণ করে নেচুরা অ্যান্ড কোম্পানি, যাকে যুগান্তকারী চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল ওই সময়। এর মাধ্যমে অ্যাভন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রসাধনী সংস্থায় পরিণত হয়।










