বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বাড়লেও স্বল্পোন্নত অন্যান্য দেশের তুলনায় জিডিপির বিপরীতে কর রাজস্বের অনুপাত প্রতি বছরই কমছে। এত কম রাজস্ব আয় দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। অন্যদিকে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোও আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় পশ্চাৎপদ। এটি দেশের বেসরকারি খাতের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে দাবি অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করতে হলে ব্যবসাবান্ধব সম্পূরক ও আবগারি শুল্ক কাঠামো তৈরি করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) উদ্যোগে মঙ্গলবার আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এ কথা বলেন। পিআরআইয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘সম্পূরক ও আবগারি শুল্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজস্ব কার্যক্রম পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

মূল প্রবন্ধে পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, ‘বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত অন্যান্য দেশের তুলনায় জিডিপির বিপরীতে কর রাজস্বের অনুপাত প্রতি বছর কমছে। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ আসে আবগারি শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামোর তুলনায় পশ্চাৎপদ। দেশে করপোরেট করহার ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার আধুনিক বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে যেখানে পরিমাণভিত্তিক আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা মূলত দামের ওপর নির্ধারিত হয়।’

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দ্য এম গ্রুপের প্রধান হাফিজ চৌধুরী। তিনি এনবিআরের বর্তমান কাঠামো আবগারি শুল্ক নির্ধারণে ন্যায্য ও যৌক্তিক শুল্কহার নিরূপণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে—সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।

উন্মুক্ত আলোচনায় কোকা-কোলা, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোসহ (বিএটি) বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা বলেন, ‘সম্পূরক শুল্ক কর বাংলাদেশে মাত্রাতিরিক্ত। এতে করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে টিকে থাকা অনেক কঠিন। এরই মধ্যে এখানে শুল্ক বেশি, তাই আগামীতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে গেলে আমাদের ভাবতে হবে। এতে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ বিনিয়োগ কমাতে হবে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রথম সচিব মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে যেসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখছে, তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে।’ সে অনুযায়ী একটি বাণিজ্যবান্ধব শুল্কনীতি প্রণয়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআরের সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা উচ্চহারের শুল্কমাত্রাকে উৎসাহিত করতে চাই না। তবে রাজস্ব আয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পূরক শুল্কহারে প্রায় ১৭ হাজার আদর্শমাত্রা রয়েছে, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। ক্ষুদ্র ও মধ্য আয়ের ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সন্তোষজনক নয়—এর একটি বড় কারণ হলো যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণের অভাব।’

সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘২০১২ সালের কর আইনে পরস্পরবিরোধী দাবির ফলস্বরূপ ২০১৯ সালে একটি যুগোপযোগী হলেও জটিল শুল্কনীতি প্রণীত হয়েছে। এ নীতি সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে একটি একক ও সহজ শুল্ক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তুলনামূলকভাবে দুই ধরনের শুল্কনীতি বেশি উপযোগী—ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নিম্নহার এবং অন্যদের জন্য একটি আদর্শহার। বর্তমানে আবগারি শুল্ক কাঠামোয় দ্বৈত নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে এক ধরনের শুল্কহার এবং দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম হার নির্ধারণ করা হয়। দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি ট্যারিফ লাইন অনুসরণ করা হলেও আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১ হাজার ৭০০টি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেশীয় পণ্যের ওপর আবগারি শুল্কহার আমদানীকৃত পণ্যের তুলনায় অনেক কম।’

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার আলোকে এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।