২০০৮ সালের ১৪ মার্চ নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক বেয়ার স্টার্নস তারল্য সংকটে পড়ে। সে বছরই ১২ সেপ্টেম্বর আরেক প্রতিষ্ঠান লেহমান ব্রাদার্স দেখে শেষ বাণিজ্যিক দিন। তার পরদিনই প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। একই বছর ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় পতন ঘটে ওয়াশিংটন মিউচুয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে। ২০২৩ সালের ১০ মার্চ ধসে পড়ে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আঘাত। একই দিনে সিগনেচার ব্যাংক থেকে এক হাজার কোটি ডলার উত্তোলন হয়। দুদিনের মাথায় বন্ধ হয়ে যায় ব্যাংকটি। সবশেষে ১৭ মার্চ ক্রেডিট সুইসের পতন ঠেকাতে নিলাম ডাকে ইউবিএস। আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে কোনো না কোনো শুক্রবারে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক খাতের সঙ্গে জড়িতদের কাছে শুক্রবার মানেই এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। যেন যেকোনো সময় আসবে কোনো ব্যাংক ধসে পড়ার নতুন খবর। 

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন খুঁজে বের করেছে ব্যাংক খাতের সঙ্গে শুক্রবারের সম্পর্ক। সিএনএন বলছে, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই জনগণকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতে চায় না। ফলে যখনই কোনো ব্যাংক টালমাটাল অবস্থায় পড়ে, তখনই পরিচালকরা তাকে ফেরত আনতে বিভিন্ন পথ খোলা রাখার কথা চিন্তা করেন। আর সেজন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকা জরুরি। অধিকাংশ ব্যাংকই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অর্থাৎ শনিবার ও রোববার খোলা থাকে না। সে হিসেবে সাপ্তাহিক বন্ধের আগে শুক্রবার থাকে শেষ কর্মদিবস। ফলে যদি কোনোভাবে শুধু শুক্রবার ব্যবসা বন্ধ (সিওবি) রাখা যায়, তাহলে পরের ৬০ ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়। আর সে সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান করে ব্যাংকটি আবারো সচল করার চেষ্টা চালানো যায়। 

শুক্রবারের বিষয়টি এক্ষেত্রে বেশ নাটকীয়। ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনের (এফডিআইসি) মুখপাত্র ডেভিড বার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, পুরো বিষয়ে ৪৫-৬০ জনের একটা দল কাজ করে। প্রিন্টার, কম্পিউটার, ফটোকপি কিংবা সংশ্লিষ্ট সব জরুরি বিষয় থাকে সঙ্গে। ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ও তাদের অর্থের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করে বের করা হয়, কী পরিমাণ সম্পদ তারল্য সংকটে পড়তে পারে। লক্ষ্য থাকে, সব খুঁত সংশোধন করে সোমবার সকালের আগে নতুন করে ব্যাংকটি চালু করা। এ সময়ের মধ্যে কেবল মালিকানাই বদলাবে না। বদলে যাবে সংশ্লিষ্ট সবকিছু। নাম, পোস্টার, চেক থেকে কাগজ পর্যন্ত।

উদাহরণ হিসেবে, ১৯৯৯ সালে বুধবারে বন্ধ করে দেয়া হয় কিস্টোনের ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাংক। প্রচুরসংখ্যক প্রতারণার ঘটনা ব্যাংকটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। অর্ধেক সম্পদেরই কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। শনি ও রোববার তো সাপ্তাহিক বন্ধই। সোমবার ছিল শ্রমিক দিবসের ছুটি। ফলে হাতে বাড়তি তিনদিন সময় পায় ব্যাংকটি। বুধবার বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে পরবর্তী প্রস্তুতি। একই ঘটনা ঘটেছে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আর নতুন করে সুদের ঝুঁকি নিতে চাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রভাবিত হয়ে আমানতকারীরা ৪ হাজার ২০০ ডলার উত্তোলন করে নেন বৃহস্পতিবার। তাদের কাছে পর্যাপ্ত কোলাটেরলও ছিল না। ফলে সারা দিন শুধু বসে অপেক্ষা না করে ১০ তারিখ দুপুরের দিকে কর্তৃপক্ষ ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনের (এফডিআইসি) দ্বারস্থ হয়। রোববারের মধ্যে এফডিআইসি সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংককে ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতার অনুমোদন দেয়। সিলিকন ভ্যালি ব্যাংককে অধিগ্রহণ করে নেয় ফার্স্ট সিটিজেন ব্যাংক শেয়ার। সোমবার সম্পূর্ণ নতুন রূপে কাজে ফেরে ব্যাংকটি। গ্রাহকরাও যথাযথ নিয়মে লেনদেন শুরু করতে পারেন।