ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সিভুক্ত (আইইএ) দেশগুলো তাদের মজুদ থেকে বাজারে ছয় কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত মজুদ থেকে ১৮ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহের ঘোষণা দেয়। উদ্দেশ্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ। সম্প্রতি সংস্থাটির পরিচালক এসব কথা জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩১টি শিল্পোন্নত দেশ আইইএর সদস্য। তবে এ সংস্থায় রাশিয়া নেই। সংস্থাটি এ নিয়ে মাসে দ্বিতীয়বারের মতো মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে যাচ্ছে। জোটটির ইতিহাসে এটি হবে পঞ্চমবারের মতো মজুদ উন্মুক্তকরণ। মূলত প্রতিবারই জ্বালানি বাজারে সংকট মোকাবেলায় এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।

আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল এক টুইটে বলেন, আইইএ বর্তমানে সমষ্টিগতভাবে ১২ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মজুদ উন্মুক্ত করার পথে এগোচ্ছে। এর মধ্যে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় কোটি ব্যারেলও রয়েছে। সংস্থাটির জন্য এটিই সর্বাধিক সরবরাহের ঘোষণা।

যুক্তরাষ্ট্রের খাতসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা জানান, প্রতি মাসে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল করে সরবরাহের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে সম্পূরক হিসেবে ভূমিকা রাখবে এসব জ্বালানি তেল। এছাড়া বছরের শেষ সময় পর্যন্ত বাজারে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবে এ মজুদ। বছর শেষে উত্তোলন বাড়বে বলেও ইঙ্গিত দেন তারা।

বিশ্লেষকরা জানান, পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও ক্রেতাদের অনীহা থাকায় রাশিয়ান জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। এ কারণে গত ৭ মার্চ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ১৪০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে। তখন আইইএ ছয় কোটি ব্যারেল মজুদ উন্মুক্ত করলেও দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ওই ছয় কোটি ব্যারেলের অর্ধেকই তখন সরবরাহ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তবে নতুন করে মজুদ থেকে সরবরাহের ঘোষণায় বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ৫ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ১০১ ডলার ৫০ সেন্টে।

কিন্তু ঠিক কবে নাগাদ ছয় কোটি ব্যারেলের মজুদ বাজারে আসবে তা জানায়নি আইইএ। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক বলেন, শিগগিরই মজুদ উন্মুক্তকরণের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।

এদিকে চলতি বছরের জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়েছে আইইএ। ইউক্রেনে হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে আরো চাপের মুখে ফেলবে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

জ্বালানি পণ্যের বাজারবিষয়ক মাসভিত্তিক প্রতিবেদনে আইইএ জানায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বর্তমানে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট যেকোনো সময় এক দশকের সর্বোচ্চে পৌঁছার আশঙ্কা রয়েছে। প্যারিসভিত্তিক সংস্থাটি বলছে, জ্বালানি বাজারের জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তা এখন বলা যাচ্ছে না। কারণ চলমান সংকটে বাজার পরিস্থিতিতে অব্যাহত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দেশটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ কারণে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম।

আইইএ বলছে, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর এখনো কোনো প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। কিন্তু অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার কারণে শীর্ষ জ্বালানি তেল কোম্পানি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, জাহাজীকরণ সংস্থা ও ব্যাংক দেশটির সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য থেকে বিরত। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দেশটি থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

আইইএ জানায়, জ্বালানি তেল রফতানিতে রাশিয়া কতটুকু লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছে তা এখনো স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না। তবে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে জ্বালানি তেল উত্তোলনে প্রতিবন্ধকতার পরিসর বড় হচ্ছে। অন্যদিকে শীর্ষ কোম্পানিগুলো রাশিয়ার জ্বালানি তেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় পণ্যটির বৈশ্বিক সরবরাহ হুমকিতে। সংস্থাটি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস প্রায় দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল কমিয়েছে। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে দৈনিক ৯ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের চাহিদা থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে।