ভিয়েতনামে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশী বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখানে রয়েছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এলজির মতো নামি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের কারখানা। এসব কোম্পানি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু বাড়তি করপোরেট ট্যাক্স, শ্রম খরচ ও চীনা কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে ভিয়েতনামে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো চড়া প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

ভিয়েতনামে কোরিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেসিসিআই) প্রতিনিধি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নতুন প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন। এ সময় তিনি চীন থেকে আসা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের কারণে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা করছে সিউলকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

ভিয়েতনামের বিদেশী বিনিয়োগে নিজেদের অবদান সম্পর্কে কিম হিয়ং-মো বলেন, ‘১৯৮৮ সাল থেকে ভিয়েতনামে বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান পরিমাণের দিকে তাকালে আমাদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে। ৮ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে প্রথম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এর পরই আছে সিঙ্গাপুর ও জাপান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভিয়েতনামে চীনের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।’

২০২৩ সালের বিনিয়োগ পরিসংখ্যান বলছে, ভিয়েতনামে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চতুর্থ স্থানে দক্ষিণ কোরিয়া। এর আগে রয়েছে হংকং, চীন ও সিঙ্গাপুর। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল এলজি ইনোটেকের ক্যামেরা মডিউলের উৎপাদন সম্প্রসারণের ঘোষণা। এর আওতায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছিল।

কিম জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো নতুন বিনিয়োগের ব্যাপারে সতর্ক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক কোরিয়ান কোম্পানি মনে করে ক্রমবর্ধমান শ্রম ব্যয়ের কারণে ভিয়েতনামে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চীনা কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।’

ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও চীন সম্পর্ককে এখন আরো শক্তিশালী করতে প্রস্তুত। ডিসেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হ্যানয়ে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নগুয়েন ফু ট্রংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন তারা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করতে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন।

ভিয়েতনামের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ বেশ খোলামেলা উল্লেখ করে কেসিসিআই প্রতিনিধি বলেন, ‘‌এর ভূরাজনৈতিক সুবিধা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল। এ কারণে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে দেশটির অবস্থান অব্যাহত রাখবে। তবে বর্তমানে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের গতিকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ মজুরি বাড়বে, সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি।’

কিম হিয়ং-মো বলেন, ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে ধীরগতির হয়েছে ভিয়েতনামে। এছাড়া অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন বিদ্যুৎ, শ্রম সমস্যা, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ফায়ার সার্ভিস আইন। এ কারণে এখানে বিদেশী কোম্পানির পক্ষে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন।’

এছাড়া সম্প্রতি আরোপ হওয়া ন্যূনতম করপোরেট ট্যাক্স ১৫ শতাংশের বাস্তবায়ন বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে ভিয়েতনামের আকর্ষণকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। ন্যূনতম ট্যাক্স নিয়মের কারণে ভিয়েতনামের কর রাজস্ব ১৪ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডংয়ের (৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার) বেশি বাড়বে বলে জানা গেছে, যার মধ্যে চলতি বছর ১০ ট্রিলিয়ন ডং দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো বহন করবে।

অবশ্য কর শুধু স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এলজির কোরিয়ান সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টেল, প্যানাসনিক, ফক্সকন, পেগাট্রন ও বোশের মতো ১২২টি বহুজাতিক কোম্পানি এ করের আওতায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অনেক জায়ান্ট ভারতে কারখানা স্থানান্তর করেছে। এখন সস্তা শ্রমের সন্ধানে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানিগুলো ভিয়েতনাম ছেড়ে ভারতের যাবে কিনা এমন প্রশ্নও উঠেছে। কিম বলেন, ‘সস্তা শ্রমের সন্ধানে চীন থেকে অনেক কোরিয়ান কোম্পানি ভিয়েতনামে চলে গেছে। এটি অনিবার্য যে ভিয়েতনামে শ্রম খরচও বাড়বে। এখন ভিয়েতনামের বিকল্প গন্তব্য খোঁজার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। তবে তা সহজ হবে না।’

কেসিসিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ভিয়েতনাম থেকে পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়ে বিবেচনা করছে না বলেও জানান। কিম বলেন, ‘কোরিয়ান কোম্পানিগুলো ভিয়েতনামে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অব্যাহত উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’