জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে বেশ কয়েক বছর ধরেই তোড়জোড় চালাচ্ছেন বিশ্বনেতারা। যার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দুবাইয়ে কপ২৮ জলবায়ু সম্মেলনে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থায় (ক্লিন এনার্জি) রূপান্তরের চুক্তি সই হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও চলতি বছর কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির রেকর্ড ব্যবহারের পূর্বাভাস দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। একই সঙ্গে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ জ্বালানির বাণিজ্য ও উত্তোলন ২০২৩ সালে সর্বকালের সর্বোচ্চে ওঠার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। খবর রয়টার্স।

সবচেয়ে অপরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে স্বীকৃত কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধিতে চীন, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি দায়ী। বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এ দেশগুলো এখনো বহুলাংশেই কয়লার ওপর নির্ভরশীল। তাই ২০২৬ সালের আগ পর্যন্ত জ্বালানিটির উচ্চ চাহিদা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে এর পর থেকে ২০২৩ সালের তুলনায় জ্বালানিটির ব্যবহার ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমে আসার সম্ভাবনা দেখছে আইইএ।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্যারিসভিত্তিক এ সংস্থা জানিয়েছে, এ বছর কয়লার চাহিদা বিশ্বব্যাপী ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৮৫০ কোটি টনে। এটিই কয়লার সর্বোচ্চ চাহিদার রেকর্ড। ভারত ও চীনের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

আইইএর প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ বছর ভারতে কয়লার ব্যবহার ৮ শতাংশ এবং চীনে ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। চীনে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে দেশটিতে কয়লার চাহিদা বেড়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর কয়লার ব্যবহার ২০ শতাংশ কমার পথে রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এর কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় কয়লার চাহিদা কিছুটা সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা সামান্য কমা সত্ত্বেও ২০২৬ সালে কয়লার ব্যবহার ৮০০ কোটি টনের ঘরেই থাকবে। তবে জলবায়ুবিষয়ক প্যারিস চুক্তি (কপ২১) বাস্তবায়ন করতে হলে কয়লার অব্যাহত ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে হবে বলে মনে করে আইইএ।

আইইএ জানিয়েছে, ১৯৯০ সালে কায়লার বৈশ্বিক ব্যবহারের এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী ছিল চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। ২০২৩ সালে অঞ্চলটিতে ব্যবহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন-চতুর্থাংশে। তবে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার সম্প্রসারণের অর্ধেকেরও বেশি হবে চীনে। ফলে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশটিতে কয়লার চাহিদা যথেষ্ট নিম্নমুখী হবে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি।

বিশ্বে কয়লা ব্যবহার ও আমদানিতে শীর্ষ দেশ চীন। দেশটির জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের তথ্য বলছে, নভেম্বরে চীনের কয়লা আমদানি আগের মাসের তুলনায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। গত মাসে দেশটি ৪ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার টন কয়লা আমদানি করেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের তুলনায় যা ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে চীন মোট ৪২ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার টন কয়লা আমদানি করেছে, যা ২০২২ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কয়লা ব্যবহারের অর্ধেকই করে চীন। সামনের বছরগুলোতে ক্লিন এনার্জির সম্প্রসারণ ও দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের ফলে কয়লার ব্যবহার যথেষ্ট কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে শুধু ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়ই কয়লার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আইইএ।

এদিকে বিশ্বের শীর্ষ তিন কয়লা উত্তোলক দেশ চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া। মোট বৈশ্বিক কয়লা উত্তোলনের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে এ তিন দেশ থেকে। ২০২৩ সালে এ তিন দেশে রেকর্ড কয়লা উত্তোলন হওয়ার প্রত্যাশা করছে আইইএ।

এশিয়ায় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এ বছর কয়লার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় পৌঁছার আশা করা হচ্ছে। চীন এ বছর ৪৫ কোটি টন কয়লা আমদানির পথে রয়েছে, যা হবে একক দেশ হিসেবে সর্বকালের সর্বোচ্চ আমদানি। এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০১৩ সালের ৩৫ কোটি টন আমদানি। অন্যদিকে রফতানিতে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এ বছর দেশটির কয়লা রফতানি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫০ কোটি টনে।