সুদহার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। তিন বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বুধবার সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তা, ঋণগ্রহীতা ও আমানতকারীর ওপর। তবে সবার ওপর এর প্রভাব একরকম হবে না।
ফেড মূলত স্বল্পমেয়াদি সুদহারকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘমেয়াদি সুদহারের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক কম। এ কারণে ফেডের নতুন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন সবচেয়ে আগে দেখা যায় পরিবর্তনশীল সুদহার ও বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি সঞ্চয়পণ্যে।
ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদহার বাড়ানোর অর্থ হলো ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে এর প্রভাব দ্রুত দেখা যায়। কারণ এসব ঋণের সুদহার দ্রুত পরিবর্তন হয়। ফলে যাদের ক্রেডিট কার্ডে বকেয়া রয়েছে, তাদের বাড়তি সুদ দিতে হবে।
ট্রান্সইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৬ হাজার ৬১০ ডলার গড় ক্রেডিট কার্ড ঋণ ও ২২ শতাংশ বার্ষিক সুদহারের একজন গ্রাহকের ন্যূনতম মাসিক পরিশোধের পরিমাণ ১ দশমিক ৩৮ ডলার বাড়তে পারে। মাসে এ বাড়তি খরচ খুব বেশি মনে না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা জমতে পারে। বিশেষ করে যারা শুধু ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধ করেন, তাদের ক্ষেত্রে মোট সুদের খরচ বেশি হতে পারে।
অনলাইন আর্থিক সেবার প্রতিষ্ঠান ওয়ালেটহাবের হিসাবে, ফেডের এবারের সুদহার বাড়ার কারণে আগামী ১২ মাসে মার্কিন ভোক্তাদের প্রায় ২০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত সুদ গুনতে হতে পারে।
মর্টগেজের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ফেডের সুদহার বাড়ার প্রভাব নতুন করে মর্টগেজের সুদহারে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আনতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে মর্টগেজের সুদহার সাধারণত ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ডের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে এ ইল্ড বেড়েছে। সরকারি ঋণ বাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাত নিয়ে উদ্বেগ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে শঙ্কাও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে সুদহার বাড়ায় সুবিধা পেতে পারেন আমানতকারী। স্বল্পমেয়াদি সুদহারের সঙ্গে উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাব, মানি মার্কেট ফান্ড, সার্টিফিকেট অব ডিপোজিট (সিডি) ও ট্রেজারি বিলের সুদের হার ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে ফেড সুদহার বাড়ালে এসব বিনিয়োগে তুলনামূলক বেশি রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ব্যাংকগুলো সবসময় ফেডের সুদহার বাড়ার পুরোটা বা দ্রুত গ্রাহকদের দেয় না। তাই সঞ্চয়কারীদের বিভিন্ন ব্যাংকের সুদহার তুলনা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংক রেটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ সঞ্চয় হিসাবে গড় বার্ষিক সুদহার ছিল দশমিক ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবগুলোয় প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায়।
বন্ডের ক্ষেত্রেও সুদহার বাড়ানোর প্রভাব রয়েছে। সুদহার ও বন্ডের দাম সাধারণত বিপরীত দিকে চলে। ফলে সুদহার বাড়লে আগে থেকে হাতে থাকা বন্ডের বাজারদর কমে যায়। তবে নতুন বন্ডে তুলনামূলক বেশি ইল্ড পাওয়া যায়। বিভিন্ন মেয়াদে পরিশোধযোগ্য বন্ড কিনে ‘বন্ড ল্যাডার’ তৈরি করলে নতুন উচ্চ সুদের সুবিধা নেয়ার সুযোগ থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেডের সুদহার বাড়ার পেছনে বড় কারণ মূল্যস্ফীতি। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফের মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
মানি ম্যানেজমেন্ট ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ২০১৯ সালের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ যেসব পণ্য কেনে, সেগুলোর দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার হারও কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একবারে ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট সুদহার বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে এমনটা নাও হতে পারে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে দেখা যেতে পারে। রয়টার্স অবলম্বনে










