বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই প্যারিসে জলবায়ু চুক্তিতে ঐকমত্য পোষণ করেছিল। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর। ২০১৬ সালের সে চুক্তির সাত বছর কেটে গেলেও বৃহৎ উৎপাদনকারীরা জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরোতে পারেনি, বরং এ সাত বছরে নিঃসরণ আরো বেড়েছে। কার্বন মেজরস ডাটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মোট গ্রিনহাউজ গ্যস নিঃসরণের ৮০ শতাংশই করছে মাত্র ৫৭টি কোম্পানি। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
খ্যাতিমান গবেষকদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য সংকলন করে সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পরিবেশবাদী সংস্থা কার্বন মেজরস। কার্বন নিঃসরণকারী এ ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি তেল, গ্যাস, কয়লা ও সিমেন্ট কোম্পানি।
শীর্ষ ১২২ দূষণকারীর মধ্যে ৬৫ শতাংশ রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও ৫৫ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানি বলে ডাটাবেজ থেকে জানা গেছে।
কার্বন নিঃসরণে ২০১৬ সালের পর সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমবিল। সাত বছরে কোম্পানিটির কার্বন ড্রাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬ গিগাটন, যা মোট বৈশ্বিক নিঃসরণের ১ দশমিক ৪ শতাংশ। এর কাছাকাছি অবদান রেখেছে শেল, বিপি, শেভরন ও টোটাল এনার্জি। এ জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রত্যেকটি কমপক্ষে বৈশ্বিক নিঃসরণের ১ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জলবায়ু দূষণ এ সময়ে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোয় কয়লার ব্যবহার বেড়ে চলেছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বকে ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে হলে তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ সেন্টিগ্রেডের বেশি হতে দেয়া যাবে না। প্যারিস সম্মেলনের লক্ষ্যমাত্রাও ছিল তাই। কিন্তু সতর্কতা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী নতুন জ্বালানি তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র খনন অব্যাহত।
২০১৩ সালে কার্বন মেজর ডাটাসেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রিচার্ড হেইড। তার মতে, উৎপাদিত পণ্যের ক্ষতি জেনেশুনেও কোম্পানিগুলো কার্বন জ্বালানির অনুসন্ধান ও উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। কোম্পানিগুলোর এ কার্যক্রম নৈতিকভাবে নিন্দনীয়। এক্ষেত্রে ভোক্তাকে দোষারোপ করা যায় না। কারণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানি দখলে রেখে জনগণকে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য করেছে।
কার্বন মেজরস প্রতিবেদনে ভিন্ন সময়রেখা ধরে কার্বন নিঃসরণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর একদিকে রয়েছে ১৮৫৪ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিঃসরণ প্রবণতা, অন্যদিকে আছে ২০১৬ সালের প্যারিস চুক্তির পর থেকে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো। শিল্প বিপ্লবের শুরু থেকে ১২২টি জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট কোম্পানি পাওয়া গেছে, যারা ৭২ শতাংশ কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে যুক্ত। তাদের নিঃসরিত কার্বনের পরিমাণ ১ হাজার ৪২১ গিগাটন।
রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর নিঃসরণের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কোম্পানির মোট নিঃসরণের ১৪ শতাংশ করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লা উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর চেয়েও এ নিঃসরণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। অন্যদিকে তৃতীয় স্থানে থাকা সৌদি আরামকোর তুলনায় তিন গুণ বেশি নিঃসরণ করেছে দেশটি। এরপর রয়েছে মার্কিন কোম্পানি শেভরন (৩ শতাংশ) ও এক্সনমবিল (২ দশমিক ৮ শতাংশ), রাশিয়ার গ্যাজপ্রম ও ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি। এরপর আছে বেসরকারি ইউরোপীয় সংস্থা বিপি ও শেল। তাদের হিস্যা গড়ে ২ শতাংশের বেশি। তালিকায় এরপর রাখা হয়েছে ভারতীয় সংস্থা কোল ইন্ডিয়াকে।
২০১৬-২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চলতি শতকের এশিয়ার উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ব্যবহার করা কয়লা নিঃসরণের এক-চতুর্থাংশের বেশির জন্য দায়ী, যেখানে সৌদি আরামকোর হিস্যা প্রায় ৫ শতাংশ। আধুনিক যুগে শীর্ষ ১০টি কোম্পানিতে রয়েছে চীনা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানির আধিপত্য। সঙ্গে আছে ভারত ও ইরান। আর ১ দশমিক ৪ শতাংশ হিস্যা নিয়ে ১১তম স্থানে আছে এক্সনমবিল।
অবশ্য এক্সনমবিল, শেভরন, বিপি ও শেল সবার নিট শূন্য নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে তাদের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ও অর্জনের পদ্ধতি ভিন্ন। তালিকার অনেক কোম্পানি এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে।
এ বিষয়ে শেলের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য নিঃসরণ জ্বালানি ব্যবসায় পরিণত হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শেল। আমরা প্যারিস চুক্তি লক্ষ্যমাত্রা পর্যায়ে উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছি। ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও অর্জন করেছি, যা ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৬০ শতাংশ।’










