প্রবাসী বাংলাদেশীদের (এনআরবি) জন্য নতুন ধরনের হিসাব চালুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে প্রবাসীরা দেশের ব্যাংকগুলোর অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে (ওবিইউ) নন-রেসিডেন্ট কনভার্টিবল টাকা অ্যাকাউন্ট (এনআরসিটিএ) খুলতে পারবেন। এ হিসাবে রাখা আমানত ও অর্জিত সুদ বা মুনাফা অবাধে বিদেশে নেয়ার সুযোগ থাকবে।
আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগের মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ (এফইপিডি-১) পরিচালক হারুন অর রশিদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অফশোর ব্যাংকিং আইন, ২০২৪ এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭-এর আওতায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য এ নতুন হিসাব সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ আরো বাড়বে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা সঞ্চয়ী, চলতি বা মেয়াদি আমানত—যেকোনো ধরনের এনআরসিটিএ খুলতে পারবেন। তবে এসব হিসাব পরিচালিত হবে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এনে টাকায় রূপান্তরের মাধ্যমে।
যেভাবে অর্থ জমা হবে
এনআরসিটিএ হিসাবে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ জমা করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যক্তিগত বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বা নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট হিসাব থেকে টাকায় রূপান্তরিত অর্থ, অন্য এনআরসিটিএ থেকে স্থানান্তরিত অর্থ এবং হিসাবের অর্থের ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফা।
এ ছাড়া এনআরসিটিএ থেকে করা বিদেশি বিনিয়োগ বা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে ফেরত আসা অর্থও এ হিসাবে জমা করা যাবে। নতুন ইস্যুতে শেয়ার কেনার জন্য দেয়া অর্থের ফেরত, অন্যান্য অনুমোদিত রিফান্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত অন্যান্য অর্থপ্রাপ্তিও এ হিসাবের আওতায় থাকবে।
বিদেশে নেয়া যাবে মূলধন ও মুনাফা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এনআরসিটিএ একাউন্টে রাখা অর্থ যদি আমানত আকারে থাকে, তাহলে তা বাজারভিত্তিক সুদ বা মুনাফা প্রদানকারী টাকাভিত্তিক হিসাব হবে। এ হিসাবের মূল অর্থ এবং অর্জিত সুদ বা মুনাফা অবাধে বিদেশে পাঠানো যাবে।
এ অর্থ স্থানীয় বৈধ ব্যয়, অন্য এনআরসিটিএ বা নন-রেসিডেন্ট টাকা হিসাবে স্থানান্তর, সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যক্তিগত বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বা নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট হিসাবে স্থানান্তর করা যাবে। পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বা পোর্টফোলিও বিনিয়োগেও ব্যবহার করা যাবে।
এনআরসিটিএ আমানত থেকে ঋণ দেয়ার সুযোগ
নতুন এ হিসাবের আওতায় সংগৃহীত আমানত দেশের বিশেষায়িত অঞ্চলের (স্পেশালাইজড জোন) টাইপ-এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে টাকায় ঋণ দেয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারবে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলো। তবে এসব ঋণ শুধু বেতন, মজুরি ও ইউটিলিটি বিলের মতো অনুমোদিত চলতি হিসাবের ব্যয় মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আয় থেকে।
এ ছাড়া এনআরসিটিএ হিসাবের বিপরীতে দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিট (ডিবিইউ) প্রবাসী বাংলাদেশী বা তাদের মনোনীত তৃতীয় পক্ষকে ঋণ দিতে পারবে। তবে এসব ঋণ পুনঃঋণ প্রদান, কৃষি, বাগানভিত্তিক কার্যক্রম বা আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য দেয়া যাবে না।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এনআরসিটিএ আমানত জামানত রেখে নেয়া ঋণের অর্থ বাংলাদেশে ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া বাংলাদেশে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য আবাসিক সম্পত্তি কেনা বা নির্দিষ্ট শর্তে দেশে এমন কিছু বিনিয়োগেও ব্যবহার করা যাবে, যেগুলো থেকে অর্থ বিদেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকবে না।
অনলাইন সুবিধা চালুর নির্দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোকে প্রবাসীদের জন্য এনআরসিটিএ খোলার ক্ষেত্রে অনলাইন ইন্টার্যাকটিভ ওয়েব প্ল্যাটফর্ম ও ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এ সুবিধা চালুর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে হিসাবের বৈশিষ্ট্য, পরিচালন পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, এনআরসিটিএ পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি), অর্থপাচার প্রতিরোধ (এএমএল/সিএফটি) করসংক্রান্ত বিধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত প্রতিবেদন দেয়ার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসীদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ দেশে আনার ক্ষেত্রে নতুন এ হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও এটি সহায়ক হবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে প্রবাসীদের জন্য নন রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (এনএফসিডি) হিসাব খোলার সুযোগ রয়েছে। প্রবাসীরা বাংলাদেশে বা বিদেশ থেকে বৈধ পথে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখার জন্য এই মেয়াদি হিসাব খুলতে পারেন। নির্দিষ্ট মেয়াদে (এক, তিন, ছয় বা ১২ মাস) রাখা এই আমানতে করমুক্ত মুনাফা পাওয়া যায় এবং জমানো অর্থ যেকোনো সময় বিদেশে পাঠানো যায়।
আর বিদেশফেরতদের জন্য রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) নামের অন্য একটি হিসাব চালুর সযোগ রয়েছে। বিদেশ সফর থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশী নাগরিকরা সঙ্গে আনা অব্যবহৃত বৈদেশিক মুদ্রা (সাধারণত ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ ডলার পর্যন্ত কোনো ঘোষণা ছাড়া) জমা রাখার জন্য এই হিসাব খুলতে পারেন। এই হিসাব থেকে সহজে বিদেশে অর্থ পাঠানো বা ভ্রমণের সময় বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে নেয়া যায়।
এছাড়া বৈদেশিক আয়কারীদের জন্য প্রাইভেট এফসি ও এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) হিসাব খোলার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন সরকারি ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে বিনিয়োগ করা যায়।










