বিশ্বজুড়েই ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে মরিয়া রাষ্ট্রগুলো। যদিও এর প্রভাব সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ের জন্য একই মাত্রায় নয়, বরং কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা মূল্যস্ফীতি দিয়ে বরং লাভবান হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য কোম্পানিগুলো। বড় অংকের মুনাফা করছে তারা। এ সম্পর্কে অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল মনে করে বিশ্বব্যাপী বৈষম্য নিরসনে সাহায্য করার লক্ষ্যে খাদ্য কোম্পানিগুলোর লাভের বিপরীতে বড় অংকের কর প্রদান করা উচিত। সোমবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় বিষয়টি তুলে ধরে দারিদ্র্যবিরোধী সংস্থাটি। খবর এপি।
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল দাভোসের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অভিজাতদের এ সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে বৈষম্যের অবস্থা তুলে ধরতে প্রায় এক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই সম্মেলনে করপোরেট ও সরকারি নেতাদের সমন্বিত প্যানেলগুলোয় এ বিষয়ক আলোচনাকে উসকে দেয়ার লক্ষ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কভিড-১৯ মহামারীসহ যুগপৎ সংকটে জর্জরিত গোটা বিশ্ব। বিশ্বের ধনীরা আরো ধনী হয়েছে এবং করপোরেট মুনাফা বাড়ছে। অক্সফামের প্রতিবেদন অনুসারে, গত দুই বছরে বিশ্বের ১ শতাংশ অতিধনী গোষ্ঠী অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সম্পদ অর্জন করেছে। এদিকে অন্তত ১৭০ কোটি শ্রমিক এমন দেশে বাস করে যেখানে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ তাদের মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। অথচ বিশ্বের কোটিপতিদের হিসাবে প্রতিদিন ২৭০ কোটি ডলার পরিমাণ অর্থ যোগ হচ্ছে।
এ সমস্যাগুলো মোকাবেলার জন্য অক্সফাম এককালীন কর আরোপ ও ধনীদের জন্য ন্যূনতম করহার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে উচ্চ কর আরোপের আহ্বান জানায়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম ধনী ও টেসলার সিইও ইলোন মাস্কের বিনিয়োগ ও লাভের বিপরীতে সত্যিকারের করহার ছিল মাত্র ৩ শতাংশের বেশি।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত বছর তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থার অত্যধিক মুনাফার ওপর করের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অক্সফাম চায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমানোর উপায় হিসেবে বড় বড় ফুড করপোরেশনকে বেশি হারে কর প্রদানের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রমগুলোকে এগিয়ে নিতে।
এ সম্পর্কে অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক গ্যাব্রিয়েলা বুচার বলেন, কোটিপতিদের সংখ্যা বাড়ছে, তারা আরো ধনী হচ্ছে এবং বড় বড় খাদ্য ও জ্বালানি কোম্পানিও অতিরিক্ত মুনাফা করছে।
বার্তা সংস্থা এপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, আমরা যা আহ্বান করছি তা হলো উইন্ডফল ট্যাক্স (অধিক মুনাফার বিপরীতে করারোপ), যা
শুধু জ্বালানি সংস্থার ক্ষেত্রে নয়, বরং খাদ্য সংস্থার ওপরও এ ধরনের কর প্রথার প্রচলন ঘটিয়ে তাদের মুনাফাবৃত্তির অবসান ঘটাতে হবে।
অক্সফামের প্রতিবেদনে এটাও বলা হয়, ধনী করপোরেশনগুলো আরো অধিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য যুদ্ধকে স্রেফ অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। সংস্থাটি আরো জানায়, অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রভাবিত শিল্পগুলোর মধ্যে খাদ্য ও জ্বালানি হলো কার্যকর অলিগোপলি। মুষ্টিমেয় বিক্রেতার এ বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব তাদের দাম বেশি রাখার সুযোগ এনে দেয়।
তবে আশার কথা, অন্তত একটি দেশ এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সেটি হচ্ছে পর্তুগাল। দেশটি এর সুপারমার্কেট ও হাইপারমার্কেট চেইনসহ প্রধান প্রধান জ্বালানি ও খাদ্য প্রতিষ্ঠানের ওপর উইন্ডফল ট্যাক্স চালু করেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেখানে কার্যকর হওয়া এ নিয়মটি বছরজুড়েই বলবৎ থাকবে। গত বছর প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের বিপরীতে কমপক্ষে ২০ শতাংশ করারোপ করা হলেও চলতি বছর থেকে পর্তুগাল সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের ওপর ৩৩ শতাংশ কর আরোপ করে। যা দিয়ে রাজস্ব কল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের সাহায্য করা হবে।
অক্সফাম ৯৫টি প্রতিষ্ঠানের ওপর করা তাদের বিশ্লেষণে আরো উল্লেখ করে, অতিরিক্ত মুনাফার ৮৪ শতাংশই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করে, যদিও ভোক্তাদের কাছ থেকেই তারা অতিরিক্ত মূল্য তুলে নেয়।










