লোহিত সাগরের সংঘাতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বৈশ্বিক নির্মাতা ও খুচরা বিক্রেতারা। পচনশীল পণ্য থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন খাতের সরবরাহ চেইনে প্রকট হচ্ছে এর প্রভাব। বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক জাহাজের রুট পরিবর্তনের ফলে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, টেক্সটাইল, পোশাক ও ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ভোক্তামূল্য বাড়তে পারে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
গত সপ্তাহে ইউএন কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন সেকশনের প্রধান জ্যান হফম্যান বলেন, ‘খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। কারণ শিপিংয়ে বেশি সময় লাগছে এবং পণ্য জাহাজীকরণের খরচও বেড়েছে।’
তিনি জানান, প্রধান বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটে বিঘ্নের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিসহ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চল ও এডেন উপসাগরের মধ্যে চলাচলকারী কয়েক ডজন বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। মূলত গাজায় হামলা ও ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করায় এসব হামলা চালিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। এ কারণে প্রধান শিপিং লাইনগুলো প্রায় একযোগে লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার ঘোষণা দেয়। এরপর সমুদ্রের পাশাপাশি ইয়েমেনে হুথি স্থাপনায় হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ বাহিনী। কিন্তু তাতেও আশঙ্কামুক্ত করা যায়নি অন্যতম এ বাণিজ্যপথকে।
ইউএন কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের দেয়া তথ্যানুসারে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের চলমান হামলার কারণে গত দুই মাসে সুয়েজ খাল দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ ৪২ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিকভাবে প্রতি বছর বিশ্ব বাণিজ্যের ১২-১৫ শতাংশ এবং বিশ্বের কনটেইনার বাণিজ্যের ২০ শতাংশের বেশি এ পথে চলাচল করে। সমুদ্রপথটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। সংঘাত শুরুর পর সুয়েজ খাল থেকে তিন শতাধিক কনটেইনার জাহাজ ঘুরে গেছে, যা বিশ্বের মোট কনটেইনার জাহাজের ২০ শতাংশ। এতে শিপিং রুটগুলোয় বড় প্রভাব ফেলেছে।
লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যয় তীব্রভাবে বেড়েছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে এক সপ্তাহে কনটেইনার ভাড়া ৫০০ ডলারের বেশি বেড়েছে। এদিকে খরা আঘাত হেনেছে পানামা খালেও, যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ। পানামার মধ্য দিয়ে মোট ট্রাফিক গত বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম ছিল, যা দুই বছর আগের তুলনায় ৬২ শতাংশ কম।
প্রক্সিমার প্রিন্সিপাল কনসালট্যান্ট ম্যাথিয়াস মেনক জানান, ‘এ হামলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খুচরা, মোটরগাড়ি ও জ্বালানি খাত থেকে আসা পণ্যগুলো।
লোহিত সাগরে সংঘাত শুরুর পর বিকল্প রুট হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বেছে নিয়েছে প্রধান শিপিং কোম্পানিগুলো। এতে গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় বেড়েছে প্রায় দুই সপ্তাহ। বিষয়টি উল্লেখ করে ম্যাথিয়াস মেনক আরো জানান, রুট পরিবর্তনের ফলে সরবরাহ গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। বিশেষত ফ্যাশন শিল্পের মৌসুমি পণ্য বিক্রয়কারীরা বেশি প্রভাবিত হতে পারেন। কোম্পানিগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চ ব্যয় বহন করলেও জাহাজের চলাচল বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে ভোক্তারা দাম বৃদ্ধির সম্মুখীন হতে পারেন।
বাজার বিশ্লেষক ক্রিসিল রেটিংসের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অনুজ শেঠি বলেন, ‘কৃষিপণ্য, সামুদ্রিক খাবারসহ পচনশীল পণ্যের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি, বর্ধিত বীমা ব্যয় ও বাণিজ্য রুটে দেরির মতো কারণগুলোর জন্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বজায় রাখা কঠিন হবে।’
এদিকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক ইস্পাত প্রস্তুতকারক চালহৌব গ্রুপের মতো খুচরা বিক্রেতা ও আসবাবপত্র জায়ান্ট আইকিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি কিছু কোম্পানিকে উড়োজাহাজ ও রেলের মতো বিকল্প পরিবহন পদ্ধতি খুঁজতে বাধ্য করেছে। কিন্তু প্রতিটি বিকল্পের নিজস্ব কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।










