সরবরাহ ঘাটতিতে পড়তে যাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ চিনি উৎপাদক ভারত। ছয় বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি রফতানি করে এলেও এখন উল্টো আমদানির পথে হাঁটতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। এল নিনোর প্রভাবসহ ভারতের শীর্ষ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোয় আখের আবাদ কমে গেছে। এতে চিনি উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়েও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর রয়টার্স।
ভারতে চিনির বিপণন মৌসুম হিসেবে অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর সময়কে ধরা হয়। গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নতুন বিপণন মৌসুমে দেশটি থেকে চিনি রফতানি বন্ধ রয়েছে। দাম নিয়ন্ত্রণে ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়ায় শুষ্ক অবস্থা দেখা দিয়েছে। এতে আখের ফলন কমে যাচ্ছে।
ফলে কৃষক এখন বিকল্প ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট কাটাতে ২০২৫ সালে ভারত চিনি আমদানি করতে বাধ্য হতে পারে বলেও মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ভারতের ৮০ শতাংশ চিনি উৎপাদন হয় পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকে। অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এ দুই প্রদেশে উৎপাদন কমে গেছে।
ভারতে প্রায় ৫ কোটি কৃষক আখ চাষ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে বিভিন্ন জাতের আখ চাষ হয়। কিছু জাত ১০ মাসে পরিপক্ব হয় এবং বাকিগুলো পরিপক্ব হতে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় নেয়। সম্প্রতি মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটক ঘুরে ২০০ জনেরও বেশি কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে ব্রিটিশ এই সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশ চিনি সরবরাহ করে ভারত। গত পাঁচ বছরে দেশটি গড়ে ৬৮ লাখ টন চিনি রফতানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারকের স্থান দখল করেছে দেশটি।
তথ্যমতে, ব্রাজিলের পর গত মৌসুমে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদন করেছে ভারত। দেশটি গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া ২০২২-২৩ বিপণন মৌসুমে ৩ কোটি ৩১ লাখ টন চিনি উৎপাদন করেছে। একই সময়ে ব্রাজিলে উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৬৯ লাখ টন। তবে চলতি মৌসুমের জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইএসএমএ)।
গত আগস্টে আইএসএমএ বলেছিল, অক্টোবরে শুরু হওয়া বিপণন বছরে ভারতে চিনির নিট উৎপাদন ৩ কোটি ১৭ লাখ টনে নেমে যেতে পারে। তবে দেশটির স্থানীয় পাঁচটি ট্রেডিং হাউজ (ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান) ভিন্ন পূর্বাভাস দিয়েছে। তারা বলছে, চলতি মৌসুমে ভারতে চিনির উৎপাদন ২ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৩ কোটি টনের মধ্যে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্সের পূর্বাভাসও এসব প্রতিষ্ঠানের জরিপের কাছাকাছি অবস্থান করছে। মাঠ পর্যায়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্স উৎপাদন ১২ দশমিক ২ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে উৎপাদন ২ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার টনের মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে এ গণমাধ্যমটি।
মহারাষ্ট্রের ১১টি আখ উৎপাদনকারী জেলার ১৮০ জনেরও বেশি কৃষক এবং কর্ণাটকের আরো ৪৯ জন কৃষক রয়টার্সকে বলেছেন, যখন আখের ফলন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ছিল তখন পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি। এ কারণে ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্স শীর্ষ আখ উৎপাদনকারী প্রদেশ দুটির প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে ১০ জন করে কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছে। এসব কৃষকের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স একরপ্রতি আখের ফলন কমে যাওয়া এবং পরবর্তী বছর আখ আবাদি জমি কমার সম্ভাব্য জরিপ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরের বছর (২০২৪-২৫) উৎপাদন আরো কমে যেতে পারে। তিনটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস হচ্ছে এ সময় উৎপাদন ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬৯ লাখের মধ্যে নেমে আসবে। রয়টার্সের জরিপও এ অংকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৪-২৫ বিপণন বছরে চিনি উৎপাদন ২ কোটি ৬৬ লাখ টনের মধ্যে থাকতে পারে বলে মনে করছে সংবাদমাধ্যমটি। তবে চলতি মৌসুমে (২০২৩-২৪) বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করছে শেষ পর্যন্ত আখের ফলন কতটা বাড়ে কিংবা কমে।
অন্যদিকে শুষ্কতার কারণে কৃষকরা এখন বিকল্প ফসল চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এ কারণে আখ আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। রয়টার্সের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর মহারাষ্ট্রে আখ আবাদি জমির পরিমাণ ৩২ শতাংশ এবং কর্ণাটকে ২৯ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এদিকে ভারতে চলতি মৌসুমে চিনির ব্যবহার রেকর্ড ২ কোটি ৯২ লাখ টন এবং পরের বছর ৩ কোটি লাখ টনে উঠতে পারে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ফলে উৎপাদনের চেয়েও চাহিদা বেশি থাকায় চিনি আমদানি করতে বাধ্য হতে পারে দেশটি।










