আগস্টে চীনা অর্থনীতি আশ্চর্যজনক স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। কভিড সংক্রমণ ও তাপপ্রবাহের প্রভাব সত্ত্বেও কারখানা উৎপাদন ও খুচরা বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী বেড়েছে। যদিও চাহিদায় পতনের কারণে ভোক্তা ও উৎপাদক পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি ধীর হয়েছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা আরো গভীর হয়েছে। এ পরিস্থিতি দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কভিডের বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে গত মাসে চীনা অর্থনীতির সূচকগুলো প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল। এটি দ্বিতীয় প্রান্তিকে সংকোচন এড়িয়ে দেশটির অর্থনীতিতে গতি ফেরার চিত্র তুলে ধরেছে।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস (এনবিএস) অনুসারে, আগস্টে শিল্পোৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বৃদ্ধির এ হার গত মার্চের পর সর্বোচ্চ। এটি জুলাইয়ের ৩ দশমিক ৮ শতাংশকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। যদিও রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকরা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছেন।
শিল্পোৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি চীনের খুচরা বিক্রিতেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত মাসে দেশটির খুচরা বিক্রি বছরওয়ারি হিসাবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ বৃদ্ধির হার গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি এটি অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জুলাইয়ের বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৭ শতাংশকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনা অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান ইভান্স-প্রিচার্ড বলেন, নতুন করে কভিডের সংক্রমণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলা অব্যাহত রেখেছে। তবে গত মাসের পরিসংখ্যান ধীরগতির পুনরুদ্ধার নিয়ে সৃষ্ট হতাশাকে কিছুটা সরিয়ে দিয়েছে। দুর্বল বাণিজ্য তথ্যের কারণে দেশটিতে ধীর পুনরুদ্ধারের আশঙ্কা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমানে সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব শীর্ষে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ আগামী দিনগুলোয় সংক্রমণ কমে আসতে পারে। তবে রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা গভীর হওয়া, ধীর রফতানি ও কভিডজনিত বিধিনিষেধের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম আগামী মাসগুলোতেও দুর্বল রয়ে যাবে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে স্থির সম্পদ বিনিয়োগ ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। এটি অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জানুয়ারি-জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়েছে। এ তথ্য নিয়ে এনবিএসের মুখপাত্র ফু লিংহুই বলেন, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কঠিনভাবে জয়ী হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার নীতি সহায়তা করেছে। তবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ভঙ্গুর এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি জটিল রয়ে গিয়েছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এদিকে অর্থনীতির অন্যান্য সূচক ইতিবাচক থাকলেও গত মাসে চীনের রিয়েল এস্টেট খাত আরো সংকুচিত হয়েছে। কারণ বাড়ির দাম, বিনিয়োগ ও বিক্রিতে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্সের হিসাব অনুসারে, আগস্টে আবাসন খাতে বিনিয়োগ ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এ হার গত ডিসেম্বরের পর সবচেয়ে বেশি কমেছে। নতুন বাড়ির দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। এটি জুলাইয়ের দশমিক ৯ শতাংশের চেয়েও বেশি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মূল চালক রিয়েল এস্টেট খাত ২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণে জর্জরিত খাতটি নানা ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলা করছে। সে সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এ খাতের জন্য বরাদ্দ অতিরিক্ত সুবিধা বন্ধ করে দেয়। অবশ্য এর জন্য দায়ীও ছিলেন আবাসন খাতের কিছু ব্যবসায়ী। তারা ঋণ পরিশোধে ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিলেন। যেহেতু আবাসন প্রকল্পগুলোর কাজ থমকে ছিল, তাই ক্রেতারাও মূল্য পরিশোধ করছিলেন না। ফলে খাতজুড়ে রীতিমতো বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। বর্তমানে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়ে নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘস্থায়ী মন্দা রোধের চেষ্টা করছেন। মেঝের পরিমাপ অনুসারে বছরের প্রথম আট মাসে আবাসন বিক্রি ২৩ শতাংশ কমে গিয়েছে। প্রথম সাত মাসেও এ কমার হার ছিল ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। এটি ভঙ্গুর চাহিদা ও দীর্ঘস্থায়ী গভীর মন্দার চিত্র তুলে ধরেছে।










