মহামারী ও পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে ইউরোপের আর্থিক খাত। মুনাফার হিসেবে ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে এ অঞ্চলের ব্যাংকগুলো। শেয়ারহোল্ডারদের উচ্চ লভ্যাংশ দেয়ার প্রতিশ্রুতির পর বাজারে প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে এ অঞ্চলের উচ্চ সুদহার। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

পুঁজিবাজারের সূচক স্টক্স ইউরোপ ৬০০ ব্যাংকস ইনডেক্স অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর মুনাফা ছয় বছরের জন্য সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে। এদিন বেশির ভাগ বাজারে ছিল ইস্টারের বন্ধের আগে লেনদেনের শেষ দিন ও বার্ষিক সূচক বৃদ্ধির হার ছিল ৩৪ শতাংশ। 

বার্কলেস ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের ব্যাংকগুলো ইকুইটির কারণে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের ইউরোপীয় ইকুইটি কৌশলের প্রধান ইমানুয়েল কাও বলেন, ‘ইউরোপীয় ব্যাংকে লেনদেন, বিনিয়োগ ও নগদপ্রবাহসহ এ খাতের মূল বিষয়গুলো আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী দেখাচ্ছে।’

ইউনিক্রেডিট, স্যান্টান্ডার ও লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ চতুর্থ প্রান্তিকের শক্তিশালী ফলাফলের সঙ্গে স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচকের ঊর্ধ্বগতির মিল রয়েছে।

গত বছর বিপযর্স্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রেডিট সুইসকে কিনে নেয় ইউবিএস ব্যাংক। এতে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউবিএসের শেয়ারও বিশেষভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সূচক এক বছরের মধ্যে ৪৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ছিল ২০০৮ সালের মার্চ থেকে সর্বোচ্চ দর। ইতালীয় ব্যাংক ইউনিক্রেডিট ও ইন্তেসা সানপাওলো যথাক্রমে ১৩ ও ৯ বছরের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে।

দুর্বল চুক্তি ও ঋণের চাহিদা হ্রাস সত্ত্বেও ২০২৩ সাল ছিল ইউরোপীয় ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বছরগুলোর একটি। এর প্রধান কারণ ছিল ক্রমবর্ধমান সুদের হার। বার্কলেসের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর ইকুইটির গড় রিটার্ন ১৩ শতাংশে বেড়েছে।

অবশ্য বছরের শেষ দিকে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার কমানো শুরু করলে নিট সুদ আয় কমে নতুন চাপ তৈরি করবে। মূলত আমানতের ওপর ব্যাংক যে সুদ দেয় ও ঋণ থেকে যে সুদ পায় তার পার্থক্য হলো নিট সুদ আয়। এটিই ব্যাংকের লাভের প্রধান উৎস।

এ বিষয়ে বিশ্লেষক সংস্থা ফিচ রেটিংয়ের ফরাসি, ইতালীয় ও পর্তুগিজ ব্যাংক বিভাগের প্রধান রাফায়েল কুইনা বলেন, ‘২০২৪ সালে সুদহার কমানোর সময় ও গতি ব্যাংকের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করবে। সুদহার আরো কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালে নিট সুদের মার্জিনের ওপর চাপ বাড়তে পারে।’

তবে কোনো সম্ভাবনাই যে সামনে নেই এমন নয়। রাফায়েল কুইনা বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়লে ব্যবসায়িক কার্যকলাপ বাড়বে ও ঋণের ওপর থেকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধক চার্জ কমে যাবে। এমন পরিস্থিতি ব্যাংককে লাভজনকভাবে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’

শক্তিশালী পারফরম্যান্স সত্ত্বেও এখনো যুক্তরাষ্ট্রের এ আর্থিক খাতের তুলনায় অনেক বেশি অবমূল্যায়িত ইউরোপীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক সংকট থেকে বেরোনোর কার্যক্রমে মার্কিন ব্যাংকের গতি বেড়েছে ও আগের চেয়ে লাভজনক হয়েছে।

মূল্যায়নের এ ব্যবধান মোকাবেলা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোও চেষ্টা করছে। মহামারীর পর থেকে লভ্যাংশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও উইন্ডফল ট্যাক্স তাদের উদ্বিগ্ন করে রেখেছিল। আস্থা ফেরানোর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ঋণদাতারা চলতি বছর শেয়ারহোল্ডারদের ১২ হাজার কোটি ইউরোর বেশি অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো লভ্যাংশ ও ৪ হাজার ৭০০ কোটি ইউরো খরচ করবে শেয়ার পুনঃক্রয় বাবদ।

ইউবিএসের পরিসংখ্যান অনুসারে, এ চিত্র আগের বছরের মূলধনের আয়ের ৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রতিফলিত করে। এটি কমপক্ষে ২০০৭ সাল থেকে যেকোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি।

চলতি বছর সবচেয়ে বড় লভ্যাংশ বিতরণের ঘোষণার দেয়া ব্যাংকগুলোর একটি ইউনিক্রেডিট। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০২৩ সালের সম্পূর্ণ মুনাফার জন্য বিনিয়োগকারীদের ৮৬০ কোটি ইউরো দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইউনিক্রেডিট।