শুল্ক কমিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি শুরুর পর বাজারে কিছুটা কমে এসেছিল চালের দাম। কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না আসায় চালের শুল্ক আরো কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে পর্যাপ্ত আমদানি না হওয়া, বৈশ্বিক চালের দরবৃদ্ধিসহ বেশ কয়েকটি কারণে আশানুরূপ কমেনি খাদ্যশস্যটির দাম। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে দেশব্যাপী লকডাউন এবং আগামীকাল থেকে সর্বাত্মক সাধারণ ছুটির ঘোষণায় অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার। এর মধ্যে দুদিনের ব্যবধানে চালের পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা। সে হিসেবে কেজি প্রতি দাম বেড়েছে ৪ টাকা। দাম বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। মূলত অল্প সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চাহিদা, পর্যাপ্ত মজুদের অভাব, সরবরাহ চেইনে ঘাটতির কারণে পণ্যটির দাম বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ। এখানকার বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণার পর সারা দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে। মূলত ব্যবসায়িকভাবে পাইকারিতে চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম নির্ধারিত হয় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বাকিতে পণ্য বিক্রি কিংবা চেকের বিপরীতে সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে। স্বাভাবিক সময়ে চালের বড় মোকামগুলোতে একটি বা দুটি লেনদেন বাকিতেই পরিচালিত হয়। পণ্য কেনার পর সেটি মোকামে এলে বিক্রি সাপেক্ষে কিস্তিতে চেক নগদায়নের মাধ্যমে লেনদেন এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু লকডাউন ঘোষণার পর মোকাম থেকেই বাকিতে পণ্য বিক্রি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া হঠাৎ করেই বাড়তি চাহিদা ছাড়াও ব্যাংকিং লেনদেনের সময়সীমা কমে যাওয়ায় দেশের ভোগ্যপণ্য বাজারে নগদ অর্থের সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে মিল পর্যায় থেকে পাইকারি বাজার এমনকি খুচরা বাজারেও বাকিতে নিত্যপণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে, যার প্রভাবে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
আগামীকাল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনের আগে প্রায় প্রতি বস্তা চালের দাম বেড়েছে ২০০-২৫০ টাকা। নতুন আমদানীকৃত চালের পাশাপাশি আমন মৌসুমে উৎপাদিত নতুন চালও বর্ধিত দামে বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে। ফলে খুচরা বাজারে পাইকারিতে বর্ধিত দামের চেয়েও বেশি দামে চাল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা, যার প্রভাবে লকডাউনের আগে চাল ক্রয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
এর মধ্যে কয়েক দিনের ব্যবধানে জিরা সেদ্ধ চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১৫০ টাকায়, পারি সেদ্ধ (নতুন) ৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৩৫০, পারি সেদ্ধ (পুরনো) ৫০-৭০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৪৭০, স্বর্ণা সেদ্ধ প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ২৯০, মিনিকেট সেদ্ধ ১৬০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৫৬০ ও কাটারি সেদ্ধ (২৫ কেজির বস্তা) ২০০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আতপ চালের মধ্যে বেতি আতপ (পুরনো) বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকায়, নতুন বেতি আতপ মানভেদে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০, মিনিকেট আতপ ১৫০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ১০০ ও ইরি আতপ ১৬০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া ভারত থেকে আমদানি হওয়া বেতির কস্টিং মূল্য কম হলেও বর্তমানে পাইকারি বাজারে এ মানের চাল বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি হওয়া নাজির সেদ্ধ চালের ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪৭০ থেকে ১ হাজার ৪৮০ টাকায়। কয়েকদিন আগেও ভারতীয় এ চালের ২৫ কেজির বস্তা বিক্রি হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৩৫০ টাকায়।
মূলত লকডাউন শুরু হলে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে চাল সরবরাহ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে প্রতিদিনই চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগের কম দামে ক্রয় করা চাল বিক্রির পর বেশি দামে সংগ্রহ করতে হবে এমন চিন্তা থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৭ নভেম্বর আমন সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। চলতি বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৭০ হাজার ১৩৬ টন আমন সেদ্ধ চাল, ৪ হাজার ৮৬৩ টন আতপ চাল ও ১২ হাজার ৩৪২ টন আমন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি পর্যায়ে চাল সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন। সরকারি পর্যায়ে কয়েক মৌসুম ধরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাল সংগ্রহ হয়নি। ২০২০ সালের বোরো মৌসুমে ১৮ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু সরকার ১০ লাখ টনের বেশি চাল সংগ্রহ করতে পারেনি। সরকারি চালের মজুদ পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে এলে বেসরকারিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির সুযোগ দেয় সরকার। এর মধ্যে কয়েক দফা আমদানি শুল্ক কমানো হলেও বৈশ্বিক দরবৃদ্ধি ছাড়াও আমদানি প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার চাল আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনলেও জটিলতার কারণে আমদানি প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে চাল আমদানির অনুমতি দিচ্ছে। ফলে সরকারি অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, সব ধরনের ব্যবসায়ীদের আমদানিতে অনীহার কারণে চালের আমদানি মূল্যও প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেড়ে যায়। এ কারণে সরকার বেসরকারি খাতে নিত্যপণ্য হিসেবে চাল আমদানি সুবিধা দিলেও সেটি কার্যকর হয়নি। তাছাড়া সর্বশেষ চলতি সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যও চালের দরবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রাইস মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী শান্ত দাশগুপ্ত বণিক বার্তাকে বলেন, লকডাউন ঘোষণার পর থেকে পাইকারি বাজারে চালের দাম বেড়েছে। আমদানি প্রক্রিয়া উন্মুক্ত না করে নির্দিষ্ট করে দেয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করতে পারেননি। এমনকি চাল আমদানির পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে সরকারিসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর ব্যবসায়ীর কাছে চালের বাজার দখল হয়ে যাওয়ায় সংকটকালে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হবে।










