দেশে গত কয়েক মাস লবণের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। দেশে ৬১ বছরের মধ্যে রেকর্ড উৎপাদন সত্ত্বেও চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর পাঁচ লাখ টন লবণের ঘাটতি থাকবে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই হঠাৎ করে আয়োডিনের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। ভোজ্যলবণের জন্য অপরিহার্য আয়োডিনের দাম বাড়ানোয় এর ব্যবহার কমে যাওয়ার পাশাপাশি লবণের বাজারে অস্থিতিশীলতা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

দেশে উৎপাদিত ও ব্যবহার্য লবণের ৯-১০ লাখ টন ভোজ্য। প্রতি ১৪-১৫ লাখ টন লবণে এক কেজি পটাশিয়াম আয়োডাইটমিশ্রিত করার নিয়ম রয়েছে। সে হিসেবে প্রতি বছর দেশে ৭০-৭৫ টন আয়োডিনের চাহিদা রয়েছে। মূলত সরকারের লবণনীতি অনুযায়ী ভোজ্যলবণে আয়োডিন মেশানোর বাধ্যবাধকতা আছে। লবণনীতি অনুযায়ী, লবণ শিল্পমালিকরা আয়োডিন আমদানি করতে পারেন না। ভোজ্যলবণের উৎপাদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আয়োডিন বিসিকের কাছ থেকে কিনে নিতে হয়। আগে কেজিপ্রতি আয়োডিন ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করলেও সম্প্রতি আয়োডিনের দাম বাড়িয়ে সাড়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। হঠাৎ করে ১১৭ শতাংশ দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন লবণ শিল্পমালিকরা। দ্বিগুণেরও বেশি দাম বাড়ানোয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি লবণ মিলমালিকদের পক্ষ থেকে আয়োডিন উত্তোলনের হারও কমে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন মালিক সমিতির নেতারা।

সম্প্রতি বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ) ও লবণ সেল প্রধান সরোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে পটাশিয়াম আয়োডেটের দাম কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে আয়োডিনের দাম বৃদ্ধিতে আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন-২০২১ ও জাতীয় লবণনীতি-২০২২ অনুুযায়ী বিসিক এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আয়োডিনের দাম বাড়ানোর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিসিকের কাছ থেকে আয়োডিন সংগ্রহের পরিমাণ কমে গেছে বলে স্বীকার করেছেন বিসিকের স্থানীয় কর্মকর্তারাও।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির অভিযোগ করেন, লবণ মিলমালিক সমিতি কিংবা লবণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই আয়োডিনের দাম বাড়িয়েছে বিসিক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আয়োডিনের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের তিন শতাধিক লবণ মিলমালিককে দ্বিগুণেরও বেশি দামে আয়োডিন কিনে লবণের সঙ্গে সংমিশ্রণ করতে হচ্ছে। এতে লবণের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দেশের ছোট-মাঝারি লবণ মিলমালিকরা সংকটের মধ্যে পড়বেন, যা আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন-২০২১ বাস্তবায়নে সরকারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক (সম্প্রসারণ) ও লবণ সেল প্রধান সরোয়ার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। কোনো বিষয়ে তথ্য প্রয়োজন হলে সরাসরি যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি।

লবণ মিলমালিকরা জানিয়েছেন, দেশে তিন শতাধিক লবণ মিল থাকলেও অধিকাংশের অবস্থাই খারাপ। মহামারীর প্রভাব ছাড়াও পুঁজি সংকটে রয়েছে লবণ মিলগুলো। দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতির কারণে বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করতে হবে পাঁচ লাখ টন লবণ। সর্বশেষ মৌসুমে রেকর্ড ১৮ লাখ ৩২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা বৃদ্ধিতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে বিসিক দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতিও দিয়েছে। সংকটের কারণে গত কয়েক মাসের মধ্যে দেশে লবণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ অবস্থায় আয়োডিনের দাম বাড়ানোয় এটির ব্যবহার কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি মিলমালিকরা বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।