ভৌগোলিকভাবে ইরানের অবস্থান এশিয়ায়, ভেনিজুয়েলার লাতিন আমেরিকায়। ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র, অন্যদিকে ভেনিজুয়েলা সমাজতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী একটি রাষ্ট্র। তবে জ্বালানি তেলের কারণে উভয় দেশের অর্থনীতি একসময় সমৃদ্ধ ছিল। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যে দুই দেশই আজ অবধি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। আরো একটি জায়গায় ইরান ও ভেনিজুয়েলার মিল রয়েছে। দুটো দেশের বিরুদ্ধেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চলছে। বিশেষত দেশ দুটির জ্বালানি তেল খাত নিষেধাজ্ঞার প্রধান লক্ষ্য। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কিছুটা হলেও সামাল দিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিকাশে জোর দিয়েছে ইরান ও ভেনিজুয়েলা। দেশ দুটি পণ্য বিনিময় শুরু করেছে। ভেনিজুয়েলা থেকে ইরানে আসছে স্বর্ণ। বিপরীতে ইরান থেকে কারাকাস অভিমুখে যাচ্ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। এ পণ্য বিনিময় ইরান ও ভেনিজুয়েলার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।

ভেনিজুয়েলায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি কিংবদন্তি সমাজতান্ত্রিক নেতা হুগো শাভেজের উত্তরসূরি। শাভেজের আমল থেকে ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্র কাঠামো থেকে সমাজতন্ত্র দূর করতে উঠে পড়ে লেগেছে যুক্তরাষ্ট্র। শাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো শক্ত হাতে সমাজতন্ত্রের পতাকা ধরে রেখেছেন। তবে ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগ থামেনি। মাদুরো সরকারকে ভেনিজুয়েলার বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে এক সময়ের সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি আজ ধ্বংসের মুখে। কেননা ওয়াশিংটনের চাপে দেশটি থেকে জ্বালানি তেল রফতানি প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। প্রধান রফতানি খাতের এ ধস ভেনিজুয়েলাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ছয় জাতির পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ চুক্তির আওতায় ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি গুটিয়ে নিতে রাজি ছিল। বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা পর্যায়ক্রমে তুলে নিতে সম্মতি দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্পের চুক্তি বাতিলের মধ্য দিয়ে এসব উদ্যোগ ভেস্তে যায়। উল্টো তেহরানের ওপর জোরদার করা হয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা।

ওই সময় থেকে ইরানের মিত্র দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ প্রয়োগের কৌশল নেন ট্রাম্প। তিনি চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোকে ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ করতে সচেষ্ট হন। এ উদ্যোগে অনেকাংশে সফল হন তিনি। ধস নামে জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ ইরান থেকে পণ্যটির রফতানিতে। চরম সংকটে পরে ইরানের অর্থনীতি।

ইরান ও ভেনিজুয়েলার মিলটা এখানেই। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উভয় দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে মার্কিন বিরোধিতা দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কাছাকাছি এনেছে। সামনে এসেছে পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা। ভেনিজুয়েলার কাছে স্বর্ণের মজুদ রয়েছে। আর ইরানের রয়েছে রফতানি করার মতো বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। দেশ দুটি স্বর্ণ ও জ্বালানি তেল বিনিময় শুরু করেছে।

ইরানের ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কপসের (আইআরজিসি) মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া সাফাভি বলেন, ভেনিজুয়েলা থেকে আকাশপথে নির্বিঘ্নে তেহরানে স্বর্ণ পৌঁছাতে শুরু করেছে। এর বিপরীতে ইরান থেকে সমুদ্রপথে কারাকাসে যাচ্ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল। একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলাকে সাইবার হামলা মোকাবেলার কলাকৌশল শেখাচ্ছে ইরান।

চলতি বছরের শুরুতে ভেনিজুয়েলায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কূটনৈতিক প্রতিনিধি এরিয়ট আব্রাম এ পণ্য বিনিময়ের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ক্রমহ্রাসমান জ্বালানি রফতানি বাজার ধরে রাখতে ইরান ও ভেনিজুয়েলা পণ্য বিনিময় শুরু করেছে। মাদুরো সরকার ইরানে স্বর্ণ পাঠাচ্ছে। এর বিপরীতে ভেনিজুয়েলার পরিশোধন কেন্দ্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি তেল পাঠাচ্ছে ইরান।

তিনি আরো জানান, শুধু চলতি বছরের এপ্রিলে কারাকাস থেকে তেহরানে নয় টন স্বর্ণ পাঠানো হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৫০ কোটি ডলার। তবে ইরান কিংবা ভেনিজুয়েলা কোনো দেশই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এখন আইআরজিসির প্রভাবশালী কর্মকর্তার বরাতে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে ইরান ও ভেনিজুয়েলার পণ্য বিনিময় বাণিজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সামলে এল।

এদিকে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর গত সেপ্টেম্বরে ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির তথ্য মিলেছে। এ সময় দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় রফতানি দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ব্যারেলে। এর আগের মাসেও ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক গড় রফতানি তিন লাখ থেকে সাড়ে সাত লাখ ব্যারেলের মধ্যে ওঠানামা করেছিল।

জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্রেকার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা সমীর মাদানি বলেন, গত মাসে ইরান থেকে একদিনে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (কনডেনসেটসহ) রফতানি হতে দেখা গেছে। দেড় বছরের মধ্যে একদিনে এ পরিমাণ জ্বালানি তেল রফতানি করেনি ইরান। এর বড় একটি অংশ তথ্য গোপন করে ভেনিজুয়েলায় গেছে বলে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের।

মিডলইস্ট মনিটর, ব্লুমবার্গ ও রয়টার্স অবলম্বনে