রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পশ্চিমা দেশগুলো। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মস্কোর বিকল্প খুঁজতে শুরু করে বিনিয়োগকারীরা। রাশিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয় একের পর এক কোম্পানি। তবে এত কিছুর পরও দেশটির বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
রাশিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী শীর্ষ ৫০টি বিদেশী কোম্পানি নিয়ে তালিকা তৈরি করেছে ফোর্বস। এতে প্রথম স্থানে রয়েছে ফরাসি গৃহ সংস্কার ও গার্ডেনিং রিটেইল প্রতিষ্ঠান লিরয় মারলিন। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে কোম্পানিটির কার্যক্রম বিস্তৃত। ২০২২ সালে রাশিয়ায় ৫২ হাজার ৯৭০ কোটি রুবল বা ৫৪০ কোটি ডলার আয় করেছে তারা। চলতি বছর রাশিয়ায় নিজেদের কার্যক্রম স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে লিরয় মারলিনের প্যারেন্ট প্রতিষ্ঠান এডিইও গ্রুপ।
ফোর্বস রেটিংয়ে যে ৫০ প্রতিষ্ঠান ঠাঁই পেয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি পরিচালনা করে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। এশীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে জাপানের তামাক কোম্পানি জেটি গ্রুপ। ২০২২ সালে তাদের আয় ছিল ৪৩৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তামাক জায়ান্ট ফিলিপ মরিসের আয় ৪০৪ কোটি ডলার। তালিকায় তাদের অবস্থান ছিল যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে রাশিয়ায় ১ হাজার ৮৭১টি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করত। তাদের অর্ধেকেরও বেশি এখনো দেশটিতে সক্রিয়। ফোর্বস তালিকায় সেরা পাঁচ কোম্পানির মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কোমল পানীয় প্রতিষ্ঠান পেপসিকো ও ফ্রান্সের ইলো। ২০২২ সালে পেপসিকোর আয় ছিল ৩১৫ কোটি ডলার। অন্যদিকে, ইলো সুপারমার্কেট চেইন আউচান ও আতাক পরিচালনা করে। ২০২২ সালে তাদের আয়ের পরিমাণ ছিল ৩০৩ কোটি ডলার।
তালিকার প্রথম সারিতে রয়েছে ডাচপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভিওন, জার্মান স্টোর মেট্রো এজি ও মার্কিন খাদ্য কোম্পানি মার্স। তাদের আয় ছিল যথাক্রমে ২৯৬ কোটি, ২৩১ কোটি ও ২০৮ কোটি ডলার। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেসলের আয়ের পরিমাণ ছিল ২০২ কোটি ডলার। চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চেরি অটোমোবাইল ১৪৯ কোটি ডলার আয় করেছে। জার্মান জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইউনিপার ১১০ কোটি ডলার নিয়ে তালিকায় ১৯তম স্থানে রয়েছে। রুশ খাদ্য প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান ডানোন রয়েছে ১৬ নম্বরে।
আগের বছরের তালিকার পাশে রেখে বিবেচনা করলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে চলতি বছরে। ২০২২ সালে বিদেশী কোম্পানি হিসেবে ফক্সওয়াগন, রেনোঁ, অ্যাপল, টয়োটা ও স্যামসাং শীর্ষে ছিল। এ বছর তারা বাদ পড়েছে। নতুন কোম্পানি হিসেবে যুক্ত হয়েছে থাইল্যান্ডের সিপি ফুডস। প্রতিষ্ঠানটি কৃষি খাতে বিনিয়োগ করে। রয়েছে বেলারুশের প্রতিষ্ঠান বেলএজেড ও চীনের বিবিকে ইলেকট্রনিকস।
নতুন র্যাংকিংয়ে চীনা কোম্পানিগুলোর অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ২০২২ সালের পর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে যে বদল ঘটেছে, সেটি এখানে লক্ষণীয়। শীর্ষ ৫০ বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২টিই ২০২২ সালে রাশিয়া ছেড়েছে। তবে বরাবরের মতো এখনো মার্কিন কোম্পানিগুলোই রাশিয়ায় শীর্ষস্থান দখল করে রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন। আগের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জার্মানি এ বছর তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে যথাক্রমে ফ্রান্স ও তুরস্ক। উভয়ের পাঁচটি করে কোম্পানি জায়গা করে নিয়েছে তালিকায়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে চীনের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে রাশিয়ার বাজারে। এ খাতে বেলারুশ, ইতালি, থাইল্যান্ড ও কাজাখস্তান প্রথমবারের মতো সেরা পাঁচের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে, তালিকা থেকে পড়েছে স্পেন, লাটভিয়া ও সুইডেন।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে ক্রেমলিন নতুন নীতি গ্রহণ করেছে। নতুন নীতি অনুযায়ী, বিদেশী কোম্পানিগুলো রাশিয়া ত্যাগের সময় যে সম্পদ রেখে যায়, সেগুলো কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পায় রুশ ক্রেতারা।










