অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে নির্মাণ মৌসুম। এ সময় সারা দেশে পুরোদমে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে ব্যবহূত হয় বিপুল পরিমাণ ইট। আমদানীকৃত কয়লার অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে এর প্রভাব পড়েছে ইটের বাজারে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতি ইউনিট ইটের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রামের দেড় শতাধিক অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। যার কারণে দেশে ইট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সরবরাহকারী এ জেলায় দেখা দিয়েছে সংকট। তাছাড়া এপ্রিল থেকে বিশ্বব্যাপী বাড়তে শুরু করে কয়লার দাম। ওই সময়ে টনপ্রতি কয়লার দাম ছিল ৮ হাজার টাকা। বর্তমানে একই মানের কয়লা টনপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার টাকায়, যার কারণে দেশের বাজারে ইট উৎপাদনের খরচও বেড়ে গেছে জানিয়েছেন ইটভাটা মালিকরা।
চট্টগ্রামের একাধিক আবাসন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইটের দাম এক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একসময় প্রতি ইউনিট ইট ৮ টাকায় ক্রয় করলেও বর্তমানে একই মানের ইট কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে ১১ টাকা। আবাসন খাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ইটের চাহদাি থাকায় ফ্ল্যাট তৈরিতে খরচও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাটের চাহিদা কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো দেড় বছর ধরে মূল্য কমিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি করছিল। বর্তমানে ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, রাঙ্গুনিয়াসহ বেশ কয়েকটি ইটভাটা অধ্যুষিত উপজেলায় কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে ইটভাটার জন্য মালিকরা কয়লা কিনে রাখেন। এ বছর কয়লার দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় অর্ধেক কয়লার মজুদ করেছেন। যার কারণে প্রতিটি ইট তৈরিতে খরচ বেড়ে যাওয়া ছাড়াও আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে ইট। ফলে চলতি নির্মাণ মৌসুমে সারা দেশেই ইটের সংকট থাকবে বলে মনে করছেন ইটভাটা মালিকরা। তাছাড়া উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুপাতে দাম বাড়ানোর সুযোগ না থাকায় ইটভাটাগুলো চলতি মৌসুমে লোকসানের মধ্যে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
চট্টগ্রামের সেরিন প্রপার্টিজের পরিচালন শুভাশিষ পোদ্দার বণিক বার্তাকে বলেন, অক্টোবরে নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়। মৌসুমের শুরুতে এ বছর ইটের দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ইটের দাম বাড়ায় ফ্ল্যাট নির্মাণের খরচও বেড়ে গেছে। সিমেন্ট, রডসহ অন্যান্য কাঁচামালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। করোনাকালীন প্রায় দেড় বছর ধরে ব্যবসায় মন্দার পর বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইটভাটা মালিক ও আবাসন খাতের কোম্পানিগুলোর দেয়া তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে প্রতিটি মাঝারি মানের প্রতি ইউনিট ইট বিক্রি হতো ৫ থেকে ৬ টাকা (মাঠ পর্যায়ে)। বর্তমানে একই মানের ইট বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে সাড়ে ৭ টাকায়। অন্যদিকে ভালো মানের ইটের দাম ছিল ৮ থেকে ৯ টাকা। বর্তমানে একই মানের ইট বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১০ টাকা থেকে সাড়ে ১১ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো মানের ইট ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যার কারণে নির্মাণ খাতে ইটের চাহিদা থাকলেও বিক্রি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ইটভাটাগুলোয় বর্তমান মৌসুমে ইট উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কয়লার দাম না কমলে দেশে ইটের দামও কমবে না। দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছে খাতসংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির অর্থ সম্পাদক মো. সামসুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, দেড় বছর ধরে আমদানি করা কয়লার দাম প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে, যার কারণে ইটভাটায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি হলেও সেভাবে ইটের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে চলতি মৌসুমে ইটভাটাগুলো বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।









