নভেল করোনাভাইরাসজনিত মহামারীর প্রকোপ কমতে না কমতেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায় ইউক্রেন-রাশিয়া। অর্থাৎ মহামারীর কারণে বিশ্বের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেয়, জ্বালানির দাম বেড়ে যায় বহুগুণ, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি দেখা দেয় মন্দার ঝুঁকি। জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাধারণ মানুষকে ব্যয় কমাতে হয়েছে। আবার ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং অব্যাহতভাবে খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদক কোম্পানিগুলোও কমিয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন। খবর রয়টার্স।

মূলত মহামারীর শুরু থেকেই পণ্যে বিশেষ ছাড় বা সুযোগ দেয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে শুরু করে বিভিন্ন কোম্পানি। আবার যেসব পণ্য কম প্রচলিত বা কম জনপ্রিয়, সেসব পণ্য উৎপাদনও কমিয়ে দেয়া শুরু হয়। সেই সময় থেকেই কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন সব পণ্যে বেশি নজর দিতে শুরু করে যেগুলো অতি জরুরি এবং প্রয়োজন হলে যেগুলোর দাম বাড়িয়ে দেয়া যাবে। 

নেসলে ও ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কম বিক্রি হয় এমন পণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে তারা যথেষ্ট অর্থ সাশ্রয় করতে পেরেছেন।  বিশেষ করে যে পণ্যগুলোর বিক্রি খুবই ধীরগতির, সেগুলো এ মুহূর্তে উৎপাদন না করাই ভালো। 

যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য উৎপাদক কোনাগ্রা সম্প্রতি তাদের ম্যারি ক্যালেন্ডারস চকোলেট চিপ কুকি ক্রিম পাই তৈরি বন্ধ করেছে। এর বদলে চিনিমুক্ত আপেল পাইয়ের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে, প্রত্যাশা করা হচ্ছে এর বিক্রি সামনের দিনে আরো বাড়বে। 

জনপ্রিয় খাদ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ক্রাফট হেইঞ্জ জানিয়েছে, তুলনামূলক কম জনপ্রিয় পণ্যগুলোর উৎপাদন পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে হেইঞ্জ রিয়েল মেয়নিজও। বিখ্যাত ওরিও বিস্কিট প্রস্তুতকারক মনডেলেজ ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডির্ক ভ্যান বলেন, ‘‌নতুন পণ্য বাজারজাতের ক্ষেত্রে তাদের কিছু কঠোর নীতি মেনে চলতে হয়। যেমন বাজারে নতুন কোনো পণ্য আনতে হলে পুরনোটি তুলে নিতে হবে।’

বাজারে মনডেলেজ ইন্টারন্যাশনালের অসংখ্য স্বাদের চকলেট রয়েছে। কোম্পানির শীর্ষ বিপণন কর্মকর্তা বলেন, ‌‘‌একটা সময় ছিল যখন আমরা নতুন স্বাদের চকলেট বাজারে আনতে পারলেই খুশি হতাম। এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন বৈচিত্র্যের চেয়ে নিয়মিত পণ্যের বিষয়ে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে।’

মার্কিন পণ্যবাজার গবেষক জাস্টিন কুক বলেন, ‘‌কম পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করতে কোম্পানিগুলোর ব্যয় বেশি হয়। এর চেয়ে যে পণ্যটি অবশ্য প্রয়োজনীয়, দরকারের সময় যেগুলোর দাম বাড়ালেও চাহিদা কমবে না, কোম্পানিগুলো এখন সেসব পণ্যের দিকেই আগ্রহী হচ্ছে।’ নেসলে জানিয়েছে, গত বছর পণ্য উৎপাদন কমিয়ে ১০৬ কোটি ডলার অর্থ সাশ্রয় করেছে তারা। একই সময়ে ইউনিলিভার সাশ্রয় করেছে ২০০ কোটি ডলার। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী পণ্যতালিকা থেকে ছাঁটাই করেছে বহুজাতিক কোম্পানিটি। 

এদিকে জনপ্রিয় নয় এমন পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ায় অনেক গ্রাহকই সুপারমার্কেটগুলোর পছন্দের পণ্য খুঁজে হয়রান হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজোট হয়ে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া পণ্যের বিষয়ে আলোচনাও করছে ক্রেতারা। এমনই এক গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জন ফিন বলেন, ‘‌প্রিয় খাদ্যের সঙ্গে মানুষের এক ধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকে। হুট করে সেটি বাজার থেকে গায়েব হয়ে গেলে ওই ভোক্তা মর্মাহত হন।’