বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ভূরাজনৈতিক বিভাজনের দিকে এগোলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। বিভিন্ন দেশ যদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত জোট অনুযায়ী আলাদা বাণিজ্য গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাত্রা ৫ দশমিক ১ শতাংশ কমতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে রফতানি কমতে পারে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। খবর আনাদোলু।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড রিপোর্ট ২০২৬-এ এ আশঙ্কার কথা বলা হয়। গত ৮০ বছরে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার অর্জন ও বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা হয় গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে।

ডব্লিউটিও বলছে, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এ ব্যবস্থা বাণিজ্য বাধা কমাতে ও দেশগুলোর মধ্যে লেনদেন বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে গত আট দশকে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ।

সংস্থাটির মহাপরিচালক এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালা বলেন, ‘গত ৮০ বছরে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরো সমন্বিত ও স্থিতিশীল করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এখন অনেক বদলে গেছে। তাই ব্যবস্থাটির সংস্কার প্রয়োজন।’

ডব্লিউটিওর প্রতিবেদনে বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো বহুপক্ষীয় বাণিজ্য সহযোগিতা আরো জোরদার করা। এতে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৯ শতাংশ ও রফতানি ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়তে পারে।

দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাণিজ্য ভূরাজনৈতিক জোটে বিভক্ত হয়ে যাবে। একে ‘জিও-ফ্র্যাগমেন্টেড ওয়ার্ল্ড’ বা ভূরাজনৈতিকভাবে খণ্ডিত বিশ্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও রফতানি ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ কমতে পারে।

তৃতীয় পরিস্থিতিতে ডব্লিউটিও-ভিত্তিক বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পরিবর্তে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক জিডিপি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ও রফতানি ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে।

ডব্লিউটিওর প্রধান অর্থনীতিবিদ রবার্ট স্টাইগারের মতে, বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার করা হলে ও বাণিজ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্যে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। অর্থাৎ বাণিজ্য ব্যবস্থার সংস্কার না করলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাণিজ্য ব্যবস্থা দুর্বল হলে উন্নয়নশীল ও ছোট অর্থনীতিগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ এসব দেশ বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় অর্থনীতির তুলনায় বেশি নির্ভরশীল। বাণিজ্য বিভাজন হলে পরিবেশ, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ডব্লিউটিও বলছে, এর অর্থ বর্তমান ব্যবস্থাকে অপরিবর্তিত রাখা নয়। বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাণিজ্যনীতি ও নিয়মকানুন সংস্কার করা প্রয়োজন।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ যখন রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে কয়েকটি আলাদা জোট বা ব্লকে ভাগ হয়ে যায়, তখন তাকে ভূরাজনৈতিক বিভাজন বলা হয়। এর প্রভাব বেশি পড়ে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে। দেশগুলো তখন নিজেদের মিত্র বা ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে ও অন্য দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা এ ধরনের বিভাজনের অন্যতম উদাহরণ। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞাও বৈশ্বিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করেছে। এখন আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধও বিশ্ব বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশ সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। আগে যেখানে কম খরচে পণ্য পাওয়া যেত, সেখান থেকে আমদানির বদলে এখন রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ বা নির্ভরযোগ্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের প্রবণতা বাড়ছে।

এভাবে বিশ্ব বাণিজ্য কয়েকটি আলাদা ব্লকে ভাগ হলে দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবার আদান-প্রদান কমতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়তে পারে। উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।