তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক চাহিদা ২০২৪ সাল নাগাদ ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে রসদ জোগাচ্ছে চীন এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে জ্বালানিটির ব্যবহার বাড়াচ্ছে এসব দেশ। ব্রিটিশ বহুজাতিক জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানি শেল এনার্জি সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এমনটা জানায়।

বছরওয়ারি ওই পূর্বাভাস প্রতিবেদনে জ্বালানি জায়ান্ট কোম্পানিটি জানায়, ২০২৩ সালে এলএনজির বৈশ্বিক বাণিজ্য আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৪০ কোটি ৪০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছিল। এ সময় জ্বালানিটির গড় দাম এবং বাজার অস্থিতিশীলতাও ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ফলে বাধাগ্রস্ত হয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি।

বিশ্বের নেতৃস্থানীয় এলএনজি কোম্পানিটি আরো জানায়, এখনো জ্বালানিটির সরবরাহ সংকোচনের মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে অব্যাহত বাড়ছে চাহিদার চাপ। কারণ শীর্ষ সরবরাহকারী রাশিয়া ইউরোপের বাজারে এলএনজি রফতানি কমিয়ে দিয়েছে। এতে অন্য দেশ থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে এসব দেশকে, যা এশিয়ার মতো শীর্ষ আমদানিকারক অঞ্চলের সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। 

এদিকে গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদাও লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৪০ সাল নাগাদ প্রতি বছর জ্বালানিটির বৈশ্বিক চাহিদা দাঁড়াতে পারে সাড়ে ৬২ থেকে সাড়ে ৬৮ কোটি টনে।

শেল এনার্জির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৩ সালে শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর তালিকায় জাপানকে পেছনে ফেলে ফের শীর্ষে উঠে আসে চীন। আগামী বছরগুলোয় দেশটি এ অবস্থান আরো শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধিতেও প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা রাখবে দেশটি।

শেল এনার্জির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ হিল বলেন, ‘‌কার্বন নিঃসরণ কমাতে কয়লার বদলে গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে চায় চীনের শিল্প খাত। ফলে চলতি দশকে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে আধিপত্য বজায় থাকবে দেশটির।’

তিনি আরো জানান, প্রতি বছর যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও তুরস্ক সম্মিলিতভাবে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, তার চেয়েও বেশি নিঃসরণ হয় চীনের কয়লাভিত্তিক ইস্পাত খাত থেকে। দেশটির কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বায়ুদূষণ ঠেকাতে গ্যাসের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিআএস ও রাইস্ট্যাডের দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছর এলএনজি আমদানিতে ২০২১ সালের রেকর্ড ভাঙবে চীন। ওই বছর দেশটি ৭ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার টন আমদানি করেছিল। এ বছর তা বেড়ে আট কোটি টনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৩ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল সাত কোটি টন। 

দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বিদ্যুৎ ও শিল্পোৎপাদনে অনেক বেশি গ্যাসনির্ভর। এসব দেশে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে চলতি দশকে এখানে এলএনজির চাহিদায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেবে বলে জানিয়েছে শেল এনার্জি।

কোম্পানির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এলএনজির ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও নতুন সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে। তবে গ্যাস আমদানি অবকাঠামোয় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রয়োজন।

এশিয়ার দেশগুলোয় ৫-১০ বছরের মধ্যে এলএনজির চাহিদা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি দশকের শেষ দিকে বেশকিছু নতুন সরবরাহ প্রকল্প চালু হওয়ার কথা। এগুলোর কার্যক্রম শুরু হলে অঞ্চলটি বাড়তি চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। 

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে এশিয়ার স্পট মার্কেটে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে জ্বালানিটির দাম। প্রতি এমএমবিটিইউর গড় মূল্য দাঁড়ায় ৭০ ডলারে। তবে ২০২৩ সালে সরবরাহ সংকট থেকে অনেকটাই শিথিল হয়। গড় দাম নেমে আসে এমএমবিটিইউপ্রতি ১৮ ডলারে। চলতি বছরও মূল্যহ্রাসের ধারা অব্যাহত আছে। বছর শেষে তা এমএমবিটিইউপ্রতি ১০ ডলারের নিচে নামতে পারে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। নিম্নমুখী দাম চীন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত বেশির ভাগ আমদানিকারক দেশকে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরবরাহ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করছে।