ভারতে জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের ব্যবহার অব্যাহতভাবে কমছে। সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে টানা চতুর্থ মাসের মতো এ পেট্রোলিয়াম পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমে ৫৮ লাখ টনে নেমেছে। যেখানে মে মাসে ব্যবহার ছিল ৭৮ লাখ টন। অর্থনীতির নাজুক অবস্থার কারণে চাহিদায় শ্লথগতির পরিপ্রেক্ষিতে ডিজেলের অন্যতম ভোক্তা দেশটি ইদানীং ক্রমবর্ধমান রফতানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে। খবর ব্লুমবার্গ।

শিল্প জ্বালানি হিসেবে পরিচিত ডিজেলকে ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিবহন ও কৃষি খাতের সঞ্জীবনী শক্তি বলা হয়। দেশটিতে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেলের। কিন্তু টানা পাঁচ প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি বিদ্যমান থাকায় অভ্যন্তরীণ চাহিদায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন খাতে প্রভাব পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই ডিজেলের ব্যবহার কমেছে। সরকারি হিসাবে, ২০১৭ সালের শুরু থেকে হিসাব করলে ডিজেলের ব্যবহার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

ডিজেল ব্যবহারে এ মারাত্মক পতনের ব্যাখ্যায় বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৬ সালের মাঝামাঝির তুলনায় বর্তমান অর্থবছরে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলতে গেলে অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে যুক্ত হয়েছে কিছু এলাকায় অস্বাভাবিক মৌসুমী বৃষ্টিপাত। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোলিয়াম পরিশোধন কোম্পানিগুলো চাহিদা পরিস্থিতি দেখে হতাশ। তারা বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাড়িয়ে দিয়েছে রফতানি। গত মাসে ভারতের ডিজেল রফতানি এক লাফে ৪৭ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ লাখ টন হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে এফজিইর শিল্প পরামর্শক র্যাচেল ইউ বলেন, দুর্বল সামষ্টিক অর্থনীতির কারণে ভারতে আমরা ডিজেলের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে বড় ধরনের পতন দেখছি। এ প্রবণতা চলতি বছরের বাকি সময়টাতেও অব্যাহত থাকতে পারে।

সরকারি উপাত্ত বলছে, ভারতে ডিজেলের ব্যবহার টানা চার মাস কমে সেপ্টেম্বরে ৫৮ লাখ টনে নেমেছে। যেখানে মে মাসেও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ছিল ৭৮ লাখ টন। এর বিপরীতে দেশটি থেকে ডিজেল রফতানি বেড়েছে। গত মাসেই রফতানি হয়েছে ৩৫ লাখ টন। যেখানে চলতি বছরের প্রথম আট মাস গড়ে রফতানি ছিল ২২ লাখ টন।

ভারতের ডিজেল রফতানি নিয়ে এনার্জি আসপেক্ট লিমিটেডের বিশ্লেষক নবীন নেহ বলেন, ভারতীয় ডিজেলের সাধারণ গন্তব্য ইউরোপ। কিন্তু সম্প্রতি এশিয়া থেকে যে হারে চাহিদা আসছে, তাতে পূর্ব দিকে ভারতের দৃষ্টি সম্প্রসারিত হতে পারে।

তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ রফতানি কিছুটা কমতে পারে, অবশ্য এরপরও দেশটির ডিজেল রফতানি ২০১৮ সালের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি থাকবে বলেই মনে করছেন নবীন।

ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড অক্টোবর ও নভেম্বরে ৬ লাখ ৫০০ টন ডিজেল রফতানির ঘোষণা দিয়েছে। যা দুই মাস আগের দুই-তৃতীয়াংশ বেশি। কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের শুরুতে ভূমিধস ও পানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উৎপাদন হার বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে রফতানি আরো বাড়বেই।

অন্যদিকে ভারতের বৃহত্তম তেল শোধনাগার ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন অক্টোবরে সরবরাহের জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল রফতানির ঘোষণা দিয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান মূলত ডিজেল আমদানি করে। কিন্তু চাহিদায় পতনের কারণে কোম্পানিটিকে সেপ্টেম্বরে অন্তত দুটি শোধনাগার বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

সিঙ্গাপুরে ফিচ সলিউশনসের পিটার লি বলেন, ভারতের ডিজেল রফতানি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া এবং এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরিশোধন কোম্পানিগুলোর বাইরের বাজার অনুসন্ধানের তাগিদ। তাছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজার ভারতের জন্য বেশ সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।