এ সময় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ২০ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল; যেখানে পুরো ব্যাংক খাতের গড় হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) মোহাম্মদ আলী এ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ডেটাভিত্তিক মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণ ব্যবস্থাপনা ও শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে এ সাফল্য এসেছে। পূবালী ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল এ তথ্য জানানো হয়।

ব্যাংকের এমডি ও সিইও মোহাম্মদ আলী জানান, ২০২২ সালে পূবালী ব্যাংকের শেয়ারদর যেখানে ১৬-২০ টাকার মধ্যে ছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও বেশি। একই সময়ে স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারত্বের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধনি ভিত্তিকেও আরো শক্তিশালী করেছে।

তিনি বলেন, ‘পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।’ এছাড়া শাখাভিত্তিক ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘ফিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা হয়েছে বলেও জানান মোহাম্মদ আলী।

এমডি ও সিইও আরো জানান, ডিজিটাল ব্যাংক খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্যাংকের ‘পাই ডিজিটাল প্লাটফর্মে’-এ সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ লাখ ২৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং ১ কোটি ৮৬ লাখ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ২৫ হাজার ৫২৫টি মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনাল ও ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপশাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে টেকসই অর্থায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগেও গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যাংকটি।

পূবালী ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকায় এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। একীভূত পরিচালন মুনাফা হয়েছে ২ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকায়।

শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩০, রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) ১৫ দশমিক ৫১ এবং রিটার্ন অন অ্যাসেট (আরওএ) ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে অবস্থান করেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ন্যূনতম সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রফতানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইএসজি ও টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৩০ শতাংশ টেকসই অর্থায়ন পোর্টফোলিওর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া ৪১১টি শাখা এবং ৪৫৩টি এটিএম/সিআরএমে সৌরশক্তির ব্যবহার, ৩৭টি লিড সার্টিফিকেশন ফ্যাক্টরিতে অর্থায়ন, আইএফআরএস এস১ ও এস২ এডপশন এবং নেট-জিরো ২০৫০ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ডিকার্বনাইজেশন পলিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটি দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘২০২৬-২৮ কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় পূবালী ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালে বছরব্যাপী ক্যাশলেস ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে, যার মাধ্যমে রিটেইল, হেল্থ, এডুকেশন, করপোরেট এবং সিএমএসএমই খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরো সম্প্রসারিত হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, সাব-ব্রাঞ্চ, সেল্ফ-সার্ভিস পয়েন্ট, পাই অ্যাপ এবং বাংলা কিউআরের সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘ব্যাংকিং দ্য আনব্যাংক’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশের আরো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চায় পূবালী ব্যাংক।’