চলতি বছরের জন্য আবারো অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়েছে ওপেক। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো চাহিদা পূর্বাভাস কমানো হলো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং চীনে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করায় জ্বালানি পণ্যটির ব্যবহার নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে।
মাসভিত্তিক একটি প্রতিবেদনে জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক জানায়, চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক ৩৩ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল করে বাড়বে। এটি গত মাসে দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় দৈনিক ৩ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল কম।
তথ্য বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৩৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ফলে অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতির চাপ আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
ওপেকের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ রোধে চীনে কঠোর লকডাউন চলছে। এ কারণে দেশটিতে জ্বালানি তেলের চাহিদায় ধস নেমেছে। ২০২০ সালের পর দেশটিতে আবারো সর্বনিম্নে নেমেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যবহার।
প্রতিবেদনে ওপেক জানায়, পূর্ব ইউরোপে চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কভিড-১৯ জনিত বিধিনিষেধের কারণে চলতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদায় ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে এসব প্রতিবন্ধতা সত্ত্বেও চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক ব্যবহার দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেল ছাড়াবে বলে প্রত্যাশা করছে ওপেক। এছাড়া চলতি বছরের গড় ব্যবহার মহামারীপূর্ব পর্যায়কেও ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওপেক বলছে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত বাড়ছে। পাশাপাশি আর্থিক সংকটও ক্রমবর্ধমান। চলতি বছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি জ্বালানি তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে।
ওপেক, রাশিয়াসহ এর মিত্র দেশগুলো ওপেক প্লাস নামে পরিচিত। ২০২০ সালে জোটটি রেকর্ড মাত্রায় জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু গত বছর করোনা পরিস্থিতি শিথিল হতে শুরু করলে জ্বালানি তেলের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। ফলে ওই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে ওপেক প্লাস। প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট হারে জ্বালানি তেল উত্তোলন বাড়াতে সম্মত হয় জোটের সদস্যরা।
তবে জোটটি গত বছর যে হারে উত্তোলন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা সংকট মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ছিল না বলে দাবি করে পশ্চিমা দেশগুলো। মার্কিন প্রশাসন ওপেক প্লাসকে উত্তোলন আরো বাড়ানোর আহ্বান জানায়। কিন্তু এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সিদ্ধান্তেই অটল রয়েছে জোটটি।
এদিকে সর্বশেষ বৈঠকে জোটটি ইউক্রেন সংকটকে একরকম এড়িয়ে বিদ্যমান উত্তোলন নীতিতে অটল রয়েছে। জুনে জোটটির দৈনিক ৪ লাখ ৩২ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন বাড়ানোর কথা রয়েছে।
তবে প্রতি মাসেই উত্তোলন বৃদ্ধির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলোর এ জোট। মূলত ওপেকের কিছু সদস্য দেশে তেল উত্তোলন ক্ষেত্রগুলোয় বিনিয়োগ কমে গিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ক্রেতারা। ফলে দেশটিও উত্তোলন কমিয়েছে। এসব কারণে জোটের জন্য লক্ষ্যমাত্রায় অর্জন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে ওপেকের জ্বালানি তেল উত্তোলন দৈনিক ১ লাখ ৫৩ হাজার ব্যারেল করে বেড়েছে। উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দৈনিক ২ কোটি ৮৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে। সে হিসাবে ওপেক প্লাসের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন বাড়াতে সক্ষম হয়নি ওপেক।
চলতি বছরের জন্য নন-ওপেক দেশগুলোর জ্বালানি তেল সরবরাহ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল করে কমানো হয়েছে। সরবরাহের পরিমাণ ধরা হয়েছে দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেল। এছাড়া ওপেক রাশিয়ার জ্বালানি উত্তোলন পূর্বাভাসও কমিয়েছে দৈনিক ৩ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তোলন অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।










