বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি নেমেছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২১ সালের অক্টোবরের পর ব্লকটিতে এত কম মূল্যস্ফীতি দেখা যায়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান বিভাগ ইউরোস্ট্যাটের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর নিউইয়র্ক টাইমস।

পরিসংখ্যান অনুসারে, ইউরোজোনের প্রকৃত মূল্যস্ফীতি (কোর ইনফ্লেশন) সেপ্টেম্বরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রকৃত মূল্যস্ফীতি পরিমাপের সময় খাদ্য ও জ্বালানির মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল মূল্যের খাতকে বাদ রাখা হয়। 

ইউরোপের বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জার্মানি। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি নেমেছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে। অথচ আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে আরেক বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ফ্রান্সের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে ঠেকেছে। তবে ইতালির ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইতালিতে মূল্যস্ফীতি আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্পেনের মূল্যস্ফীতি চলতি বছরে বেশ কম ছিল। তবে সেপ্টেম্বরে সূচক বেড়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। 

ইউরোজোনের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি ক্রোয়েশিয়ার। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বিপরীতে নেদারল্যান্ডস রয়েছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। নেদারল্যান্ডসই ইউরোজোনের একমাত্র দেশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ঘরে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কম। আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যান্থিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ক্লাউজ ভিসতেসেন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার যাত্রায় এটা শুরু মাত্র। আগামী দিনগুলোয় আরো কমতে থাকবে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তো আগামী বছরে প্রকৃত মূল্যস্ফীতির হার ২ দশমিক ৯ শতাংশ থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেই।’‌ 

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) হয়তো সুদহার আর বাড়াবে না। চলতি মাসে ইসিবির পরবর্তী সভা। সুদহারের কারণে ব্যবসা ও ভোক্তা আগ্রহে যে ভাটা পড়েছিল, তাও হয়তো দ্রুত ফিরে পাবে গতি। ইসিবির প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে জানিয়েছিলেন, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রায় না নামলে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত আসবে না। তিনি বলেন, ‘‌হুট করে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই আমরা। এখনো অনেক পথ বাকি।’ 

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দশমবারের মতো সুদহার বাড়িয়েছে। উচ্চ সুদহারের কারণে বেড়ে গেছে ঋণসংশ্লিষ্ট ব্যয়। প্রভাব পড়েছে নতুন কিনতে যাওয়া বাড়ি, গাড়ি এমনকি ফ্রিজেও। বাড়তি খরচের কারণে চাহিদা কমেছে এ কথা সত্য। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্বের ঝুঁকি।

অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, ইউরোপের অর্থনীতি একের পর এক কিছু আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। উদাহরণস্বরূপ মাহামারী সময়ে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়া ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সময়ের প্রয়োজন।

এদিকে মূল্যস্ফীতি কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ইউরোজোনে অর্থনৈতিক সংকোচন দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার বৃদ্ধি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শিল্পোৎপাদন কার্যক্রম, পরিষেবা খাত ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে।