আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ইসলামিক ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি পেশাদারত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফজলে কবির। গহতকাল বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে বাংলাদেশ আওফি ফেলোজ ফোরাম (বাফ) আয়োজিত দিনব্যাপী ইসলামিক ফাইন্যান্স কনফারেন্সের সমাপনী অধিবেশেনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ আহ্বান জানান তিনি।
এসময় ফজলে কবির বলেন, শরিয়াহ নীতির মধ্যে চলতে চাইলে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা, নৈতিক আচরণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আরো বেশি পেশাদারিত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। ইসলামের অনুসারীদের জন্য শরীয়ার মূল নীতিকে সমুন্নত রাখতে এবং ইসলামী অর্থের স্বচ্ছতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে আরো বেশি সচেষ্ট হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ইসলামী অর্থব্যবস্থা নিছক কিছু নিয়মকানুন নয়, বরং ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতায় নিহিত আর্থিক লেনদেনের জন্য একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। পেশাদারদের ইসলামিক ফাইন্যান্সের আর্থিক জটিলতা, প্রযুক্তিগত এবং নৈতিক বিবেচনা- উভয় বিষয়েই পারদর্শী হওয়া উচিত। ক্রমবর্ধমান শিল্পের সঙ্গে শরিয়া বিধিমালার সমন্বয় নিশ্চিতে ক্রমাগত শিক্ষা এবং বিশেষীকরণ অপরিহার্য। অন্যান্য অনেক ব্যবস্থার মতো ইসলামিক ফাইন্যান্স বাংলাদেশের সকল স্টেকহোল্ডারদের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। এর ক্রমবর্ধমান বাজার দেশের আর্থিক খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ও গুরুত্ব যোগ করেছে।
বাহরাইনভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থায়ন বিষয়ক মানদণ্ড প্রণয়নকারী সংস্থা অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের (আওফি) ফেলোদের সংগঠন বাফ এবার চতুর্থ বারের মতো ইসলামিক ফাইন্যান্স কনফারেন্সের আয়োজন করে। এতে মিডিয়া পার্টনার ছিল বণিক বার্তা।
সমাপনী অধিবেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার বলেন, ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করতে চান না, লোকসান ভাগাভাগি করতে চান। এক্ষেত্রে যতভাগ লোকসান ভাগাভাগি করা হবে, লাভেরও ঠিক ততটুকু ভাগ গ্রাহকদের দেয়া উচিৎ। সমাপনী অধিবেশনে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন আল-আরাফা্হ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়াম্যান আলহাজ আব্দুস সামাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন্নাহার এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খান । বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হুমায়রা আজম ।
কনফারেন্সে উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী ইসলামী অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ জুড়ে আছে ইসলামি ব্যাংকিং। দেশে প্রায় ৪০টি ব্যাংক ইসলামি ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা, সম্প্রসারণ ও সমর্থনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ইসলামী ব্যাংকিং নির্দেশিকা সংশোধন এবং ইসলামিক ব্যাংকিং আইনের খসড়া তৈরির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ ইসলামী অর্থায়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
ইসলামি অর্থনীতির নামে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে জানান বাফ কনফারেন্সের আহ্বায়ক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের হেড অব ইসলামিক ব্যাংকিং এ কে এম মিজানুর রহমান। অ্যাকাডেমিক অধিবেশনে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের নার্ভ বোঝার চেষ্টা করা উচিত। কেনো তারা ইসলামিক ফাইন্যান্সের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে? কেনো তারা ইসলামিক ফাইন্যান্স বেছে নেয়? তাদের প্রত্যাশা কী? আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, ইসলামী অর্থব্যবস্থাপ্রেমী জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের প্রত্যাশার প্রতি মনোযোগ না দিয়ে ইসলামিক ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পালন করা এ খাতের পেশাদারদের জন্য পরিচয় সংকট তৈরি করবে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাফের সভাপতি ও বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মহব্বত হোসেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত বাফ শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, নিয়ন্ত্রক, স্ট্যান্ডার্ড সেটার এবং ইসলামিক ফাইন্যান্সের মূল স্টেকহোল্ডারদের একত্রিত করে একটি প্রাণবন্ত সম্প্রদায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আওফিতে বিশেষজ্ঞ সংখ্যায় বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬০০ এর বেশি সার্টিফাইড ইসলামিক প্রফেশনাল অ্যাকাউন্টেন্ট এবং সার্টিফাইড শরীয়াহ অ্যাডভাইজর অ্যান্ড অডিটর (সিএসএএ) রয়েছে।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন আব্দুল্লাহ জাফরী । এতে ‘বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ৫ম দশকে পদার্পন: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ মুনিরুল মওলা এবং ‘ইসলামী অর্থায়নের ঝুঁকি শেয়ারিং দর্শনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক আলোচনা উপস্থাপনা করেন মালয়েশিয়ার ইনসেফ বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ড. ওবাইয়্যাতুল্লাহ ইসমাত বাছা।
দুপুরে ইসলামিক ব্যাংকিং প্যানেল ডিসকাশনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের হেড অব শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক ঘরে বসেই ডিপোজিট করতে পারবে, লোন নিতে পারবে। এ সময়ে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমাদের সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এ প্যানেল ডিসকাশনে সভাপতিত্ব করেন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দীন আহমেদ।
বিকালে ইসলামিক ক্যাপিটাল মার্কেট ও তাকাফুল ডিসকাশন সেশনে মালয়েশিয়ার আইএনসিইআইএফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, শরিয়াহ কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
জামিয়া শরিয়াহ মাদ্রাসার ডেপুটি মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম বলেন, ‘বাংলাদেশে ইসলামী তাকাফুল কিসের ভিত্তিতে চলছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এরই মধ্যে আইডিআরে তাকাফুল বিধিমালা জমা হয়েছে। ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নেই। ১৯৯৯ সালে ইসলামী বীমা শুরু হলেও এখনো গাইডলাইন নেই। স্বীকৃত কোনো তাকাফুল মডেল নেই, শুধু একটি কোম্পানি ছাড়া। ইসলামী ব্যাংকিং ও বীমা একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু ইসলামী বীমা এখনো পিছিয়ে।
তিনি আইডিআরে তাকাফুল সেকশন চালু, বিধিমালা প্রণয়ন, শরিয়াহ ট্রেনিং চালু, ইন্সপেকশন, অডিট ও গভর্ন্যান্স চালু করার প্রস্তাব তুলে ধরেন। প্যানেল ডিসকাশনে সভাপতিত্ব করেন বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইস্তিসনার চেয়ারম্যান ড. মো. আনোয়ার হোসাইন মোল্লা।
কনফারেন্সে বাংলাদেশে ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিং বিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণা, শরীয়াহ্ গভর্নেন্স বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় মোট ৭ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। বাফ শরীআহ্ স্কলার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্বিবদ্যালয়ের চেয়ারম্যান সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন আব্দুল্লাহ জাফরী এবং বাফ শাহ আব্দুল হান্নান অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ইসলামিক ব্যাংকস কনসালটেটিভ ফোরাম (আইবিসিএফ)। বাফ এম আযীযুল হক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আব্দুল আউয়াল সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ড. মুহাম্মদ আমীর হোসাইন, আইএফএ কনসালটেন্সির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট কামাল হোসাইন, ইসলামী ব্যাংক ট্রেইনিং অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমির গবেষণা প্রধান মো. আতিকুর রহমান খান খাদেম এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা আব্দুর রহমান ফেরদৌস বাফ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
দিনব্যাপী সম্মেলনে বিভিন্ন অধিবেশনে দেশী ও আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে প্যানেল আলোচনায় ৮টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থায়ন: ইতিহাসের পাতা ফিরে দেখা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাম্বাসাডর মোহাম্মদ মহসীন, ‘ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধির জন্য করণীয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব। আরো প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মুহাম্মদ কবির হাসান, এ কে এম মিজানুর রহমান, মো. আতিকুর রহমান খান খাদেম, মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম ও মুহাম্মদ আব্দুর রহিম।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন ব্যাংক ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশীজনরা। এতে ৫ শতাধিক দেশী ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক ব্যাংকিং ও অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনে ‘সুকুক: স্ট্রাকচারিং, ইস্যুয়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স’, ‘বাংলাদেশে সুদমুক্ত ব্যাংকিং এবং এম. আযীযুল হক’ ও ‘সুদ: সমস্যা ও সমাধান’ এ তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।










