মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালক এর শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটির বেকারত্বের হার অর্ধ শতকের মধ্যে সর্বনিম্নের কাছাকাছি এবং মূল্যস্ফীতিকে পেছনে ফেলে গড় মজুরিও বেড়েছে। যদিও একই সময়ে প্রযুক্তি, অর্থ, গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রধান খাতের বড় কোম্পানিগুলো বড় সংখ্যায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। জানুয়ারিতে দেশটিতে ছাঁটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে আগের মাসের তুলনায় দ্বিগুণ। খবর সিবিএস নিউজ।

প্রশিক্ষণ সংস্থা চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের নতুন এক বিশ্লেষণ অনুসারে, মার্কিন কোম্পানিগুলো জানুয়ারিতে ৮২ হাজার ৩০০-এর বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা ডিসেম্বর থেকে ১৩৬ শতাংশ বেশি।

এমন পদক্ষেপে শক্তিশালী এ শ্রমবাজারে কর্মীদের মধ্যে চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক বলে মনে করছে মার্কিন গণমাধ্যম। পরিসংখ্যানও বলছে, দেশটিতে বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়েছে। গতকাল প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা খাতে জানুয়ারিতে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার কর্মী নিয়োগ হয়েছে। বেকারত্বের হার ডিসেম্বরে ৩ দশমিক ৭  থেকে কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

সাম্প্রতিক ছাঁটাইগুলো বেশির ভাগই কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে কেন্দ্রীভূত। বিষয়টি উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে মার্কিন চাকরির বাজার শক্তিশালী রয়েছে কিন্তু ছাঁটাইয়ের সাম্প্রতিক তরঙ্গ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২১ ও ২২ সালে মার্কিন অর্থনীতি কভিড-১৯ মহামারীর প্রাথমিক ধাক্কা মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়ায়। চাকরির বাজারে লক্ষ্য করা যায় চাঙ্গা ভাব। ওই সময় ভালো বেতন ও কর্মপরিবেশের আশায় লাখ লাখ আমেরিকান নতুন চাকরিতে যোগ দিতে পুরনো চাকরি ছেড়ে দেন। এ প্রবণতা এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘দ্য গ্রেট রেজিগনেশন’ হিসেবে। ২০২২ সালে মার্কিন অর্থনীতিতে ৪৮ লাখ নতুন চাকরি তৈরি হয় কিন্তু পরের বছর তা নেমে আসে ২৩ লাখে। জেপি মরগান ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের মতে, মহামারীর আগের বছরগুলোয় নিয়োগের তুলনায় এ হার এখনো এখনো বেশি।

গত সপ্তাহে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষকরা এক প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘শ্রমবাজারের অবস্থা শিথিল কিন্তু চাকরির বাজার সবল রয়েছে।’

মার্কিন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং কোম্পানি গোল্ডম্যান স্যাকস সম্প্রতি ১ হাজার ৪৫৯ ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর জরিপ চালায়। যেখানে চাকরির বাজারের জন্য উৎসাহজনক তথ্য পাওয়া গেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৫৭ শতাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসা, যার প্রায় ৪৬ শতাংশ বেসরকারি খাতের—তারা এ বছর নতুন কর্মী নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তিন-চতুর্থাংশ চলতি বছরের আর্থিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

এমন শক্তিশালী আশাবাদ সত্ত্বেও ২০২৪ সালের শুরুতে ছাঁটাই উদ্বেগ তৈরি করেছে। চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের বিশ্লেষণ অনুসারে, বছরের প্রথম মাসে ছাঁটাইয়ের সংখ্যা গত জানুয়ারিতে ছিল ২০০৯ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। ওই সময় মার্কিন অর্থনীতিতে মহামন্দা বিরাজ করছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ২ লাখ ৪১ হাজারের বেশি কাটছাঁট হয়। 

চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস উল্লেখ করেছে যে জানুয়ারির চাকরি ছাঁটাই বেশির ভাগ আর্থিক ও প্রযুক্তি খাতে। আর্থিক সংস্থাগুলো গত মাসে সর্বাধিকসংখ্যক ছাঁটাই ঘোষণা করেছে, যার পরিমাণ ২৩ হাজার ২০০-এরও বেশি। এ আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এ খাতে সর্বাধিক ছাঁটাই হয়, যার পরিমাণ ২৭ হাজারের বেশি। এ খাতে সবচেয়ে বেশি ২০ হাজার পদ খালি করার ঘোষণা দিয়েছে সিটি গ্রুপ।

বিশ্লেষণ অনুসারে, দ্বিতীয় বৃহত্তমসংখ্যক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছে প্রযুক্তি খাত, যার পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার। অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন গুগল, মাইক্রোসফট ও সেলসফোর্স গত মাসে হাজার হাজার কর্মী কমানোর ঘোষণা দেয়।

তুলনামূলক কম হলেও ছাঁটাইয়ে পিছিয়ে নেই গণমাধ্যম। সংবাদ সংস্থাগুলো জানুয়ারিতে মোট ৫২৮ কর্মী কমিয়েছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় ১ হাজার ৬৬০ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করেছে চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস।

কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের কারণ দেখিয়েছে। কিছু কোম্পানি বলছে, সুদের হার বৃদ্ধির কারণে খরচ কমাতে চাইছে। অন্যরা বলছে, মহামারীকালীন অতিরিক্ত নিয়োগের পর কর্মী ছাঁটাই করছে। কিছু ব্যবসা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের জন্য পরিকল্পনার পুনর্বিন্যাস করছে, যার কারণে নন-এআই ব্যবসায়িক ইউনিটে কাটছাঁটে যাচ্ছে।

এক বিবৃতিতে চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু চ্যালেঞ্জার বলেন, ‘এই ছাঁটাই বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রবণতা নির্দেশ করে। বিভিন্ন খাত বর্ধিত অটোমেশন ও এআই গ্রহণের দিকে কৌশলগত পরিবর্তনে মনোনিবেশ করেছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ছাঁটাইয়ের প্রধান চালক হলো খরচ কমানো।’

কোম্পানিগুলোর ওপর এ চাপ বছরের সামনের মাসগুলোয়ও অব্যাহত থাকতে পারে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে।

ফেডারেল রিজার্ভ চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা চান তারা। মন্দা এড়াতে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্থিতিশীলতায় তাদের মনোযোগ। বেকারত্বের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ছাড়াই শ্রমবাজার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে আসছে।’