অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় বাজার চীন। এ কারণে শীর্ষ আমদানিকারক এ দেশটির বাজার ধরতে সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনিজুয়েলাসহ জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকরা মুখিয়ে থাকে। ক্রমবিকাশমান এ জ্বালানি বাজারে আধিপত্য পোক্ত করতে রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। তবে চীনা আমদানিকারকরা জ্বালানি তেলের জন্য প্রধানত সৌদি আরবের ওপর নির্ভলশীল। তবে ধীরে হলেও চিত্রপট বদলাচ্ছে। চীনের জ্বালানি তেলের বাজারে সৌদি আরবের একক আধিপত্য ক্ষীণ হয়ে আসছে। বিপরীতে বাড়ছে রাশিয়া ও ইরানের বাজার হিস্যা। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিস্থিতির আভাস মিলেছে। খবর অয়েলপ্রাইসডটকম ও রয়টার্স।
চীনা রাজস্ব বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চলতি বছরের মার্চে দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত মার্চে চীনা আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছেন। এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময় চীনের বাজারে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। বেড়েছে রাশিয়া ও ইরান থেকে।
চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে চীনা আমদানিকারকরা সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ কম। এর বিপরীতে রাশিয়া থেকে চীনের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি এক বছরের ব্যবধানে রেকর্ড ৩১ শতাংশ বেড়েছে। গত মাসে চীনা আমদানিকারকরা রাশিয়া থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছেন।
পরিমাণের বিচারে এখনো চীনে জ্বালানি তেলের আমদানি বাজারে শীর্ষ জোগানদাতা হিসেবে রয়েছে সৌদি আরব। তবে মার্চের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ বাজারে রাশিয়ার ক্রম উত্থানের চিত্র সামনে এসেছে। কেননা এ সময় চীনের বাজারে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল আমদানি কমলেও রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।
চলতি বছরের মার্চে ইরান থেকে চীনা আমদানিকারকরা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়েছেন। এ সময় চীনের বাজারে ইরান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে। তবে সৌদি আরবের বিপরীতে রাশিয়া ও ইরান থেকে আমদানি বাড়ালেও গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো জ্বালানি তেল আমদানি করেনি চীন। এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকায় দক্ষিণ আমেরিকার মিত্র দেশ ভেনিজুয়েলা থেকেও গত মাসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ রেখেছে চীন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে চীনের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি অনেকটাই কমে গেছে। বছরের প্রথম দুই মাসে চীনে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল। সেই হিসেবে মার্চে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় আমদানি এক লাখ ব্যারেলের নিচে নেমেছে।
এ পরিস্থিতির পেছনে খাতসংশ্লিষ্টরা নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীকে চিহ্নিত করেছেন। তারা জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে চীন। এ সময় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে লকডাউন ঘোষণা করে মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়। মানুষ কার্যত ঘরবন্দি জীবন কাটায়। স্থবির হয়ে পড়ে চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানিসহ সামগ্রিক অর্থনীতি। এতে পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন খাতে দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যায়। ফলে চীনা আমদানিকারকরা বাধ্য হয়ে জ্বালানি পণ্যটির আমদানিতে লাগাম টানেন।
তবে সৌদি আরবের বিপরীতে রাশিয়া ও ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়ানোর পেছনে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কারণ সামনে আনেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিশ্বব্যাপী মন্দা শুরু হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট এড়াতে তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করতে শুরু করেছে রফতানিকারকরা। বিশেষত মার্চের শুরুতে সৌদি আরবের সঙ্গে মূল্যযুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি পণ্যটিতে বিশাল মূল্যছাড় দেয় মস্কো। এ সুযোগ কাজে লাগাতে চীনা আমদানিকারকরা সৌদি আরবের বিপরীতে রাশিয়ার প্রতি ঝুঁকে যান। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চাপের মুখে থাকা ইরানও বেইজিংয়ের কাছে তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বেচেছে। এ কারণে তেহরানের কাছ থেকে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি বাড়িয়েছে চীন।
রয়টার্সের পণ্যবাজারবিষয়ক বিশ্লেষক ওয়ান তাও বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন, রাশিয়া, ইরান বরাবরই এক ঘরানার। বিভিন্ন ইস্যুতে এসব দেশ সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে অবস্থান নেয়। জ্বালানি তেলের বাজারে মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার মূল্যযুদ্ধ শুরু হলে চীন নীতিগত কারণে রাশিয়া ও ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের জ্বালানি তেলের আমদানি বাজারে আধিপত্য পোক্ত করার প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের বিপরীতে এক ধাপ এগিয়ে গেছে রাশিয়া। এমনকি রিয়াদের শীর্ষ অবস্থান দখলে রিয়াদের ঠিক পেছনেই রয়েছে মস্কো। ফলে আগামী দিনগুলোয় চীনের বাজার দখলের লড়াইয়ে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রতিযোগিতা আরো জোরদার হতে পারে।










