বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুন এখনো বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের (এফএসসিডি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশে মোট ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে মোট ১৪০ জন নিহত ও ৩৪১ জন আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। সে বছর ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ডে ১০২ জন নিহত হন, যেখানে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটই ছিল প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৯ হাজারের বেশি বা প্রায় ৩৪-৪০ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের উৎসই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। আর এ শর্টসার্কিটের অন্যতম প্রধান কারণ মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার। সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭০টিরও বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মোকাবেলা করছে ফায়ার সার্ভিস।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্টসার্কিটজনিত অগ্নিকাণ্ডের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক কেবল, সুইচ ও সংযোগসামগ্রী। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লোড, পুরনো কেবলের ক্ষয় কিংবা অদক্ষ ইনস্টলেশনের ফলে কেবলের ভেতরে অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয়, যা থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্মত ইলেকট্রিক সামগ্রী ব্যবহার একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। ভালো মানের বৈদ্যুতিক কেবল সাধারণত একাধিক সুরক্ষা স্তর (মাল্টিলেয়ার ইনসুলেশন) দিয়ে তৈরি হয় এবং এতে পর্যাপ্ত তামার ব্যবহার ও তাপ সহনশীল আবরণ থাকে, যা শর্টসার্কিটের ঝুঁকি কমায়।
একইভাবে মানসম্মত সুইচ ও সকেটে শক্ত সংযোগ ব্যবস্থা এবং তাপ সহনশীল উপাদান ব্যবহৃত হয়, যা স্পার্ক বা লুজ সংযোগের সম্ভাবনা হ্রাস করে। লাইট ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক অ্যাকসেসরিজেও নিরাপত্তা মান অনুসরণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অগ্নিকাণ্ড কমাতে সরকারিভাবে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সচেতনতামূলক প্রচারণা, ভবন নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, নিরাপদ ওয়্যারিং এবং অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগের প্রভাব এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছেনি। বিশেষ করে আবাসিক ভবন, পুরোনো বাজার, ছোট দোকান ও অপ্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনাগুলোয় নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার, অপরিকল্পিত ওয়্যারিং ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বৈদুত্যিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হলে অগ্নিদুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের উপসহকারী পরিচালক মো. শাহজাহান শিকদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত বাসাবাড়ি বা বাণিজ্যিক স্থাপনায় বৈদ্যুতিক কেবল দেয়াল বা ডেকোরেশন সামগ্রীর ভেতর দিয়ে টেনে নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত এসবের রক্ষণাবেক্ষণ বা পরিবর্তন করা হয় না। দেখা যায় ৫০ বছর আগে স্থাপন করা হয়েছে, দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত সেটার আর খেয়াল রাখা হয় না।’
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে মানহীন বৈদ্যুতিক কেবল ও সরঞ্জামের ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের কাজগুলো আমরা মিস্ত্রি দিয়ে করিয়ে থাকি। মালপত্র কেনার দায়িত্বও তার ওপরে থাকে। এ ক্ষেত্রে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বাজার থেকে নিম্নমানের সরঞ্জাম সংগ্রহ করার প্রবণতা থাকে, যা থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গোলযোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যালয়ে একটা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। সেটা হচ্ছে, কার্যালয় স্থাপনের সময় হয়তো পাঁচজন কর্মী আর ১০টা কম্পিউটার নিয়ে কাজ শুরু হয়। পরে ব্যবসা ভালো হলে সেখানে লোকবল, কম্পিউটার ও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে। কিন্তু সে তুলনায় বৈদ্যুতিক কেবল বা সরঞ্জামের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় না। ফলে শর্ট সার্কিট হয়ে থাকে। এছাড়া লুজ কানেকশনের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণেও স্পার্কের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিরতিহীনভাবে বৈদুতিক সরঞ্জাম ও বিদ্যুৎ চালিত মেশিন ব্যবহারের ফলেও অনেক সময় গোলযোগ তৈরি হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিদ্যুতের ব্যবহারটা সার্বজনীন। কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাই যত্নবান ও সচেতন হচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি আগুন লাগার কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ। তাই বৈদুত্যিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা যদি আরো বেশি সচেতন ও যত্নবান হতে পারি, তাহলে এ-সংক্রান্ত অগ্নিদুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।’
মানসম্পন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অগ্নিদুর্ঘটনার বড় কারণ মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার। অনেকেই খরচ বাঁচাতে বা সস্তায় চলনসই বা নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এর ফলাফলের ব্যাপারে তারা সতর্ক নন। আবার দেখা গেল, আমরা ডিজাইনে বলে দিই কোন ক্যাটাগরির বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু ডেভেলপার বা ঠিকাদার সে মান মেইনটেইন করেন না। তখন অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়।’








