দেশের কৃষি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কীটনাশক বা বালাইনাশক। এ বাজার এখনো আমদানিনির্ভর হওয়ায় প্রতিনিয়ত নানা প্রতিবন্ধকতা সামলাতে হয় সংশ্লিষ্টদের। বাজারে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেয়ার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধও সামলাতে হয়। মতবিরোধের জেরে পৃথক বাণিজ্য সংগঠনের স্বীকৃতি ও ট্রেড অর্গানাইজেশন (টিও) লাইসেন্স নিয়ে সরকারি পর্যায়ে একাধিকবার শুনানি হলেও বিষয়টির স্থায়ী নিষ্পত্তি হয়নি। অভিন্ন বাজারে সংগঠনগত এ বিরোধ দেশের কীটনাশক শিল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও নীতিগত ভারসাম্য রক্ষায় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংগঠনের বিরোধের পটভূমি একটু উল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কৃষকদের বিনামূল্যে কীটনাশক বিতরণ করা হতো। ১৯৭৯ সালে এ বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। তখন কয়েকজন ব্যবসায়ীর উদ্যোগে পেস্টিসাইড অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পিএবি) গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে তারা নাম বদলে বাংলাদেশ ক্রপ প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিসিপিএ) কার্যক্রম পরিচালনা করে। বর্তমানে দেশে ১ হাজার ৩৪০ জন কীটনাশক আমদানিকারক রয়েছে। বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদনকারী মাত্র ২২টি। আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীর মধ্যে বিশাল ভারসাম্যহীনতার কারণে বাণিজ্যিক স্বার্থের পার্থক্য দেখা দেয়। এজন্য ২০১৯ সালে স্থানীয় উৎপাদকরা পৃথক সংগঠনের দাবি জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। অবশেষে ২০২২ সালে স্থানীয় উৎপাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) নামে অনুমোদন পায়।
অনুমোদনের পর থেকেই আমদানিকারকদের সংগঠন বিসিপিএ আপত্তি জানাতে শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে বামার টিও লাইসেন্স বাতিলের জন্যও তারা চেষ্টা করে কিন্তু সফল হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি), এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একাধিকবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবারই বামার স্বীকৃতি বাতিলের পক্ষে উপযুক্ত কারণ বা যুক্তি পাওয়া যায়নি।
অবশেষে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা একটি আপিল শুনানির পর খারিজ হয়ে যায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্তও দেয় যে ভবিষ্যতে আর শুনানির সুযোগ নেই। তার পরও সংগঠনের লাইন্সেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়; কিন্তু তা সফল হয়নি। এরই মধ্যে এফবিসিসিআই বামাকে প্রথম শ্রেণীর বাণিজ্য সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
অর্থাৎ বামা কীটনাশকের স্থানীয় উৎপাদকদের কার্যকর সংগঠন। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় উৎপাদকদের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এরই মধ্যে সরকার স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য ৩৬টি কাঁচামালের আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ এবং সব কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রায় শূন্য করে দিয়েছে। আমদানি করা মানহীন কীটনাশক দিয়ে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত হচ্ছে না। আবার নিম্নমানের কাঁচামাল হওয়ায় উৎপাদিত কীটনাশক রফতানিও করা যাচ্ছে না।
বাজারের আকারও এ বিরোধের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৬-৭ হাজার কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে এসে এ বাজারের আকার দাঁড়ায় ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হিসাবে বাজারটির আকার ১৮-২০ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজারের একটি বড় অংশ স্থানীয় উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে কীটনাশক উৎপাদন হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ কমতে পারে। পাশাপাশি প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের মান, কাঁচামালের গুণগত মান, কৃষকের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কীটনাশকের মতো কৃষির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। যেখানে আমদানি প্রয়োজন সেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পকে উৎপাদন ও প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ফলে সংগঠনগত বিরোধের বাইরে গিয়ে আমদানি, স্থানীয় উৎপাদন, প্রতিযোগিতা, কৃষকের স্বার্থ ও শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়াই এখন মূল বিষয়।










