দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। দেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন লিমিটেডের চাহিদার ভিত্তিতে এ তরঙ্গ বরাদ্দ দিতে চায় বিটিআরসি। তবে তরঙ্গ বরাদ্দে অন্য অপারেটরদের সমস্যা তৈরি করবে কিনা সে বিষয়ে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম আগামী এপ্রিলে শুরু হবে। সেলফোন অপারেটরদের সহযোগিতায় বিটিআরসি এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। বিটিআরসি সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
বিটিআরসি ও সেলফোন অপারেটরদের সূত্রে জানা যায়, এপ্রিলের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তরঙ্গ ব্যবহারের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হবে। সেলফোন অপারেটররা এরই মধ্যে যন্ত্রপাতি আমদানির কার্যক্রম শুরু করেছে। এপ্রিলেই এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কোনো ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা বা নেটওয়ার্ক বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে গ্রামীণফোনকে তরঙ্গ বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করবে বিটিআরসি।
জানা যায়, ২০২৩ সালে ৮৫০ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ চেয়ে বিটিআরসির কাছে চাহিদা জানায় গ্রামীণফোন লিমিটেড। এটি আপলিংকের জন্য ৮২৪ মেগাহার্টজ থেকে ৮৪৯ মেগাহার্টজ এবং ডাউনলিংকের জন্য ৮৬৯ মেগাহার্টজ থেকে ৮৯৪ মেগাহার্টজ পর্যন্ত পরিসীমা কাভার করে থাকে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বিটিআরসি। তবে বিটিআরসির এমন বরাদ্দ পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে0রবি ও বাংলালিংক। অপারেটর দুটি বলছে, দেশের বেসরকারি খাতের তিন টেলিকম অপারেটর ৯০০, ১১০০, ২১০০ ও ২৬০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ ব্যবহার করে থাকে। এতদিন পর্যন্ত তিন অপারেটরই এক ধরনের প্রযুক্তি দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গ্রামীণফোনকে ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দ দিলে টেলিকম খাতে অপারেটরদের দুই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। ফলে দেশের টেলিকম খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানান, সেবার মান ধরে রাখতে গ্রামীণফোনকে দেশব্যাপী অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়েছে, টাওয়ার স্থাপন করতে হয়েছে। ৮৫০ ব্যান্ডের তরঙ্গের মাধ্যমে অনেক বেশি টাওয়ার ও অবকাঠামো দিয়ে সেবা প্রদান করতে পারবে গ্রামীণফোন, যা অন্য দুই অপারেটরের জন্য ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে।
গ্রামীণফোনের চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ দিতে বিটিআরসি রাজি হলেও এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে অন্য দুই অপারেটর রবি অজিয়াটা লিমিটেড ও বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন। দুই অপারেটরের দাবি, ৮৫০ ব্যান্ডের তরঙ্গ ব্যবহারে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় বিপর্যয় তৈরি করবে এবং অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়ে বিটিআরসিতে যৌথ চিঠি দিয়েছে দুই অপারেটর।
গত ১৭ ডিসেম্বর বিটিআরসিকে লেখা রবি ও বাংলালিংকের যৌথ চিঠিতে বলা হয়, আমরা যৌথভাবে বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তি অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। আমাদের পরামর্শে মনে হয়েছে, ৮৫০ ব্যান্ডের ৮৭০ থেকে ৮৮০ মেগাহার্টজের উচ্চ তীব্রতার ইজিএসএম ব্যান্ডের সঙ্গে পিজিএসএম ব্যান্ডের নিম্ন থেকে মাঝারি তীব্রতায় সংঘাত সৃষ্টি করবে। এতে চার সেলফোন অপারেটরের নেটওয়ার্কের মধ্যে বাধার পরিস্থিতি তৈরি করবে।
রবি ও বাংলালিংকের একটি সূত্র বলছে, ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড বরাদ্দের কারণে বিদ্যমান অবকাঠামোয় কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। এর জন্য গ্রামীণফোনকে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে বাধা তৈরি করবে বিদ্যমান রবি ও বাংলালিংকের প্রযুক্তিতেও। এ ব্যান্ড বরাদ্দ হলে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে রবি, বাংলালিংক ও টেলিটককেও নতুন প্রযুক্তি ইনস্টল করতে হবে। না হলে দুর্বল নেটওয়ার্কে গ্রাহক অসন্তোষ বৃদ্ধি পাবে। নতুন ব্যান্ডের হস্তক্ষেপ বিদ্যমান সাইটের গুণমানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে, যার ফলে উচ্চ কল ড্রপ, ভয়েস মানের বিকৃতি এবং কম ডাটা গতি হবে।
বিটিআরসি জানায়, টেলিকম অপারেটরদের তরঙ্গ বরাদ্দ দিতে সাধারণত নিলাম ডাকা হয়। কিন্তু গ্রামীণফোনকে তরঙ্গ বরাদ্দ দিতে নিলাম ডাকা হচ্ছে না। সাধারণত প্রতিযোগী থাকলে তখন তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয়। কিন্তু ৮৫০ ব্যান্ড মেগাহার্টজের তরঙ্গের চাহিদা শুধু গ্রামীণফোন জানিয়েছে। সেজন্য নিলাম না ডেকে ২০২১ সালের তরঙ্গ নিলামকে ভিত্তি বিবেচনা করে নিলাম ডাকা হবে।
জানতে চাইলে বিটিআরসির কমিশনার প্রকৌশলী শেখ রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ৮৫০ ব্যান্ডের তরঙ্গের চাহিদা দেয়া হয়েছে। ৮৫০ ব্যান্ডের তরঙ্গগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। গ্রামীণফোনের চাহিদার ভিত্তিতে বিটিআরসি তরঙ্গ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা পর্যালোচনা করছি, পর্যালোচনা শেষে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত দিতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘এ তরঙ্গের চাহিদা একটি অপারেটরের থাকায় নিলাম করা সম্ভব হচ্ছে না৷ বিটিআরসির সর্বশেষ তরঙ্গ নিলামকে বেজ ধরে আমরা মূল্য নির্ধারণ করব। আপাতত রবি ও বাংলালিংকের দাবিকে যৌক্তিক মনে হয়নি। এখন আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’










