মানসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে দেশে প্রতি বছর ২০-৪৪ শতাংশ শাকসবজি এবং ফলমূল নষ্ট হয়। যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার। আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি এবং শহরের নাগরিকদের জীবনাচরণ পরিবর্তন হওয়ায় প্রতিনিয়ত কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনার চাহিদা বাড়ছে। দেশে এখন এ খাতের বাজার প্রায় ৩৮ লাখ ডলারের, যা ২০৩১ সালের মধ্যে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৮ লাখ ডলারে পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশ কোল্ড চেইন ইনভেস্টমেন্ট কনফারেন্সে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও মার্কিন কৃষি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। সভায় দেশের কোল্ড স্টোরেজ খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
কনফারেন্সে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লিক্সক্যাপ অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইলিয়াম ফেলোস। তিনি মূল প্রবন্ধে বলেন, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের কোল্ড চেইন খাতের সঙ্গে স্টোরেজ, পরিবহন, প্যাকেজিং ও লেভেলিং মিলিয়ে প্রায় ৪৪ কোটি ডলারের বাজার তৈরি হবে। বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে এ খাতের চাহিদা বাড়বে। আর ২০২৪ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ২০ কোটি ডলারের বাজার তৈরি হবে।
উইলিয়াম আরো বলেন, এক্ষেত্রে অর্থায়ন একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে কোল্ড স্টোরেজ খাতের যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর শুল্কহার বেশি। বাংলাদেশে এ খাতে গড় শুল্কহার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ভারতে এ হার সাড়ে ১১ শতাংশ। থাইল্যাল্ডে এ হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় মাত্র ৫ শতাংশ।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, ‘কোল্ড স্টোরেজের স্বল্পতার জন্য আমরা উৎপাদিত কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারছি না। আমাদের অধিকাংশ কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করা হয়। সেক্ষেত্রে অন্যান্য কৃষি পণ্য যেমন পেঁয়াজ, গাজর, বিভিন্ন ধরনের দেশী ফল, সবজি ও মাছ ইত্যাদি স্টোরেজের সুযোগ খুবই কম। অন্যদিকে যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় পরবর্তী সময়ে পণ্যগুলো আমদানি করতে হচ্ছে এবং ভোক্তাদের অধিক মূল্যে ক্রয় করতে হচ্ছে। কোল্ড চেইনে বিনিয়োগের অপার সুযোগ আমাদের রয়েছে। শুধু দেশীয় প্রয়োজন মেটানোই নয় বরং রফতানির জন্যও এটি অপার সম্ভাবনাময়।’ এ সময় তিনি বেসরকারি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কোল্ড স্টোরেজে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান।
সুদের হার নিয়ে তিনি বলেন, ‘সুদের হার কমানোর কথা থাকলেও এখনো কমেনি। বৈশ্বিক কারণে সুদের হার বেড়েছে। তবে এর মধ্যেও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে কীভাবে বিনিয়োগকারীদের সাবসিডি দেয়া যায় সেটা নিয়ে কাজ করা হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘দেশের কোল্ড স্টোরেজগুলো মূলত ৬০-এর দশকে তৈরি করা। সেগুলো আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফরিদপুর, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পেঁয়াজের ভালো উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের অভাবে তার ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ভারতীয় আমদানি বন্ধ হলেই পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকার ওপরে চলে যায়। তাছাড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুগোপযোগী না হওয়ায় ফরমালিনযুক্ত ফল খাচ্ছেন ভোক্তারা। এমন পরিস্থিতিতে ১৩ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো ব্যবসায়ী কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করতে আসবে না। তাই এ খাতে নতুন ঋণনীতি দরকার। এতে ভোক্তারাও সহনীয় মূল্যে পণ্য কিনতে পারবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘জাতীয় লজিস্টিক নীতি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এতে কোল্ড স্টোরেজ খাতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি এ নীতির আলোকে ৬৩ দফা সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। আর কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে ভূমির জটিলতা কাটাতে পিপিপি মডেলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। তাছাড়া শুল্কও কমাতে হবে এ খাতে। কারণ যন্ত্রাংশ আমদানিতে ভিয়েতনামের চেয়ে তিন গুণ বেশি শুল্ক দিতে হয় দেশে।’










