অনেক দিন ধরে দেশে পণ্যবাজার ঊর্ধ্বমুখী। কয়েক দফায় বেড়েছে চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ প্রভৃতি নিত্যপণ্যের দাম। এর মধ্যে চলছে রমজান। ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে সরকারিভাবে রমজানে চাহিদা থাকা ছয়টি পণ্যের দাম বেঁধে দেয়া হয়েছে। যদিও বাজারে তা কতটা মানা হচ্ছে, সেটি নিয়ে আছে প্রশ্ন। এমন এক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার খবর মিলছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জ্বালানি থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের দাম এখন বাড়তির দিকে। এর আঁচ আমাদের দেশে আবারো পড়বে বৈকি।
চলমান মহামারীতে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। দ্বিতীয় প্রবাহ মোকাবেলায় আবারো দেশে দেশে চলছে লকডাউন। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ নিগড় চাপের মুখে। মূলত এর প্রভাবেই বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার বর্তমানে অস্থির। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পণ্যের আমদানির ওপর বাংলাদেশ নির্ভরশীল। এটি বহিস্থ দিক। অন্যদিকে দেশে করোনা পরিস্থিতিও অবনতিশীল। দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে দেশে চলছে লকডাউন। লকডাউনের কারণে স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থাও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার আরো অস্থির হওয়ার আশঙ্কা। কাজেই সামনের দিনে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ।
লক্ষণীয়, লকডাউনের কারণে নানা শ্রেণী-পেশার সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। বিশেষ করে দিনমজুরের আয় বলতে গেলে বন্ধ। আবার বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। রমজানের এ সময়ে বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দামে তাদের ভোগান্তি বেড়েছে। জোরালোভাবে ত্রাণ তত্পরতা বাড়ানো গেলে তাদের দুর্ভোগ কিছুটা কম হতো। কিন্তু এবারের লকডাউনে ত্রাণ কার্যক্রম বেশ অপ্রতুল। এ অবস্থায় বিশ্ববাজারের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরো অস্থিতিশীল হলে নিম্ন আয় ও দরিদ্র মানুষের কষ্টের অন্ত থাকবে না। ভোক্তাসাধারণ পড়বে আর্থিক চাপে। তাই নানামুখী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার কাজটি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।
একটি প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী দেশে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেন। বৈশ্বিক প্রভাবে কিছুটা বাড়া বা সমন্বয় করা নিশ্চয়ই যুক্তিসংগত। তাই বলে অসামঞ্জস্যহীনভাবে দাম বাড়ানো হবে, এটি কাম্য নয়। এটা সর্বতোভাবে অনৈতিক। এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে বাজার নজরদারি জরুরি। ভোক্তাসাধারণের জন্য দাম সহনীয় রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এজন্য টিসিবির তত্পরতা বাড়াতে হবে। রমজানের আগে থেকেই সরকার টিসিবির কার্যক্রম কিছুটা বাড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ট্রাকে করে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এসব পণ্য কিনতে ট্রাকের পেছনে লোকজনের দীর্ঘ সারি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ থেকে অনুমেয় নিম্ন আয়ের মানুষগুলো আসলে কতটা কষ্টে আছে! বিশ্ববাজারের প্রভাবে দাম আরেক দফা বাড়লে সাধারণ মানুষ আরো বিপর্যস্ত হবে বৈকি। সুতরাং বৈশ্বিক আঁচ প্রশমনে স্থানীয় বাজারে ট্রাকসেলের পরিসর যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি পণ্য বিক্রির পরিমাণও বাড়াতে হবে। সার্বিকভাবে টিসিবি কার্যক্রমকে আরো বেশি কার্যকর করে তুলতে হবে।
দামজনিত বহিস্থ অভিঘাত মোকাবেলার আরেকটি উপায়, কর-শুল্ক কাঠামোর সমন্বয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, চিনি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল—খাদ্য ও কৃষি খাতের সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। একই পরিস্থিতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, কয়লাসহ প্রায় সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে। এমনকি কৃষির অপরিহার্য উপকরণ সারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী মূল্য মানেই এসব পণ্য বাড়তি দামেই কিনতে হবে আমাদের। মানুষের জীবনধারণ, কৃষি, অবকাঠামো, শিল্পসহ পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিপুল। আমদানি শুল্ক কমানো হলে খরচ কম পড়বে এবং স্থানীয় বাজারেও দাম কমে রাখা যাবে। এখন পর্যন্ত সরকার কেবল চাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক সমন্বয়ের সময় এসেছে। সংশ্লিষ্টরাও এ ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। এটি আমলে নেয়া যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের অত্যধিক নির্ভরতায় বারবারই আমরা দামজনিত অভিঘাতের সম্মুখীন হই। এর একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান জরুরি। সেক্ষেত্রে দেশে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, তার প্রচেষ্টা নিতে হবে। বিশেষ করে করোনাকালে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি বারবার জোর দিচ্ছেন। এটি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সক্রিয়তা চাই।
এও সত্য, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় না-ও থাকতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্যের দাম নির্ভর করে নির্বিঘ্ন ও পর্যাপ্ত সরবরাহের ওপর। দেশে ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ফলে পর্যাপ্ত জোগান থাকলেও দাম বেড়ে যায়। তাই বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে খাদ্যপণ্যের সরকারি মজুদ বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির দিকেও কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে। বাজারে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান। দায়ীদের চিহ্নিত করে নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। দুঃখজনকভাবে সরকারের হস্তক্ষেপ ব্যবস্থায় এখনো কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। সেগুলো দূর করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে রাষ্ট্রের কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবি।










