যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল দেশটির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি হোয়াইট হাউজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনের ফলকে অনেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হতে যাচ্ছে বিভক্ত সরকারের নতুন অধ্যায়। হোয়াইট হাউজে থাকবেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট, আর কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াশিংটনের এ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ ঢাকায় কতটা এসে লাগবে? বিষয়টিকে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মতো বাণিজ্যনির্ভর, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ থাকা এবং ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের এ পরিবর্তনের অর্থ হতে পারে নতুন বাণিজ্যিক বাস্তবতা, উন্নয়ন সহযোগিতার ভিন্ন অগ্রাধিকার এবং কূটনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন। তবে মনে রাখতে হবে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতি রাতারাতি পাল্টে যায় না, বরং পরিবর্তনটি বুঝতে হবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের আলোকে।
প্রথমত, বাংলাদেশের রফতানি ও তৈরি পোশাক খাত। বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। এ বাজারে আমাদের রফতানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। ফলে মার্কিন বাণিজ্যনীতি আমাদের রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কনীতি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘোষিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোয় বাংলাদেশী পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশী বস্ত্র ও পোশাক রফতানিতে শূন্য পাল্টা শুল্কের সুযোগ তৈরির কথাও রয়েছে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানির সম্পর্ক থাকবে।
এখানে নতুন কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী বাণিজ্য ও শুল্ক নির্ধারণে কংগ্রেসের মৌলিক ক্ষমতা রয়েছে। যদিও বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তবু ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির ওপর অধিকতর নজরদারি, শুনানি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে। তবে একে বাংলাদেশের জন্য শুল্ক ছাড়ের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার কারণ নেই। কারণ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, ন্যায্য মজুরি এবং উৎপাদনশীলতা নিয়ে কঠোর অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সংস্কারের সুযোগ। বিশেষ করে শ্রমিকের সংগঠন করার অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং শ্রম আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
দ্বিতীয়ত, ডলার, সুদের হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজন দেশটির রাজস্বনীতি, বাজেট এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন টানাপড়েন তৈরি করতে পারে। বড় ধরনের করছাড় কিংবা সরকারি ব্যয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এখানেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ফেডারেল রিজার্ভ একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের কারণে সরাসরি সুদের হার কমবে বা বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সুদের হার নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক পরিস্থিতিই প্রধান বিবেচ্য।
তবু মার্কিন রাজস্বনীতি, সরকারি ঋণ, বন্ডের সুদ এবং ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান আমাদের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল হলে সেখানকার ভোক্তাদের পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমতে পারে। ফলে ডলারের বিনিময়মূল্যে স্বস্তি এলেও রফতানি আদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের তাই শুধু ডলারের গতিবিধি নয়, মার্কিন ভোক্তাবাজারের চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকেও নজর রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন সহযোগিতা, গণতন্ত্র ও সুশাসন। ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক দর্শনে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশগত সুরক্ষা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মার্কিন প্রশাসনের এসব বিষয়ে জবাবদিহি বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে এখন বড় সুযোগ ও দায়িত্ব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস জলবায়ু অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং মানবিক সহায়তার মতো বিষয়গুলোতে তুলনামূলক বেশি আগ্রহ দেখাতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে কংগ্রেসের আগ্রহ থাকলেই অর্থছাড় নিশ্চিত হবে, এমন নয়। বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনের অগ্রাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপরও এসব সহযোগিতা নির্ভর করবে। তাই আমাদের কূটনীতিকে শুধু সহায়তা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান। ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লেও চীনের ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এককভাবে চাপ প্রয়োগের চেয়ে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিত কৌশল গ্রহণে বেশি আগ্রহী হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নেয়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি বাড়ানো এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখা—সবই আমাদের জাতীয় স্বার্থের অংশ। কিন্তু বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যত তীব্র হবে, ততই এসব সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে। কোনো একটি পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিবেচনাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী? প্রথমত, রফতানি বৈচিত্র্যকে আর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রাখা যাবে না। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালকা প্রকৌশল খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাত, রাজস্ব প্রশাসন, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগ পরিবেশে সংস্কার ত্বরান্বিত করতে হবে। বিদেশী বাজারে সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজেদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্যই এসব সংস্কার জরুরি। তৃতীয়ত, স্থানীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় বাংলাদেশের জন্য কিছু নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে এর সঙ্গে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। বিভক্ত সরকার মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে জবাবদিহি বাড়াতে পারে, কিন্তু আমাদের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা, আর্থিক স্থিতিশীলতা কিংবা ভূরাজনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করবে না। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও নতুনভাবে বিন্যস্ত হবে।
অতএব, প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা নয়। বরং আগামী দুই বছরে বাংলাদেশ নিজের অর্থনীতিকে কতটা প্রতিযোগিতামূলক, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা কার্যকর এবং পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে পারবে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। অন্য দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল না রেখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যেই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিহিত।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার










