গত সপ্তাহের তাপপ্রবাহের পর দেশের তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকায়ও মিলছে শীতের আমেজ। তবে বাতাসের মানে উন্নতি নেই। বর্ষা ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময়ের মতো গতকালও ঢাকার বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের সূচকে গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। প্রথম দুই স্থানে ছিল কুয়েত সিটি ও কলকাতা। এ সময় ঢাকার বায়ুমান সূচক ছিল ১৬৪, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত।

নির্মাণকাজের ধুলাবালি, গাড়ির কালো ধোঁয়াসহ নানা উৎসের দূষণে বহু বছর ধরেই বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে থাকছে ঢাকা। দূষণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোও। সম্প্রতি ঢাকার সবচেয়ে দূষিত ১০টি পর্যবেক্ষণস্থলের মধ্যে স্থান পেয়েছে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডির বিভিন্ন স্থান এবং প্রগতি সরণি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন ও বাণিজ্যের জন্য এসব এলাকা ঢাকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে নির্মল বাতাসের অভাবে ভবিষ্যতে বাসিন্দাদের কাছে এলাকাগুলোর আকর্ষণ কমতে পারে।

বায়ুমান সূচকে শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ‘ভালো’, ৫১ থেকে ১০০ ‘মাঝারি’ এবং ১০১ থেকে ১৫০ ‘সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০০-এর বেশি হলে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ হিসাবে রাজধানীর উল্লিখিত অভিজাত এলাকাগুলোর বাতাসও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে।

আইকিউএয়ারের সূচকে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার পর্যবেক্ষণস্থলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণ রেকর্ড করা হয় আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন (বিআইডিএস) এলাকায়। সেখানে বায়ুমান সূচক ছিল ১৮৬। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বারিধারা পার্ক রোডে স্কোর ছিল ১৬৮। এরপর বাড্ডার প্রগতি সরণি ও বেচারাম দেউড়িতে ১৬৭, বারিধারা লেকসাইড ও ধানমন্ডিতে ১৬১, গুলশান লেক পার্কে ১৬০, বনানীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ১৫৬ এবং গুলশান ২-এর গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকায় ১৫১ স্কোর রেকর্ড করা হয়। সব ক’টি স্থানের বাতাসই ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির বায়ুদূষণের পেছনে স্থানীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আশপাশ এলাকার দূষণেরও প্রভাব রয়েছে। কড়াইল বস্তিতে মাটির চুলায় রান্না ও বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া গুলশান-বনানীতে এবং কামরাঙ্গীরচরের দূষণ ধানমন্ডি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে প্রগতি সরণির খোঁড়াখুঁড়ি থেকে ছড়ানো ধুলাবালি বারিধারার বায়ুদূষণ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘লেকসংলগ্ন অভিজাত এলাকাগুলোতে বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে বেশকিছু ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণ কাজ করে। জলাশয়ের ওপরের বাতাসে আর্দ্রতা ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় ধূলিকণা ও ধোঁয়া (পিএম ২.৫ ও পিএম ১০) সহজে ভাসতে পারে না; বরং জলীয় বাষ্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এগুলো ভারী হয়ে বাতাসে ঝুলন্ত অবস্থায় আটকে থাকে। এছাড়া শীতকালে তাপমাত্রা বিপরীতমুখী হওয়ার কারণে লেকপারের ঠান্ডা বাতাস নিচে এবং ওপরে গরম বাতাস ঢাকনার মতো তৈরি করে। ফলে যানবাহনের ধোঁয়া বা ধুলাবালি ওপরে উড়ে যেতে না পেরে নিচেই পুঞ্জীভূত হয়।’

গুলশান ও বনানীর ভৌগোলিক বিন্যাসে সুউচ্চ ভবনের ভূমিকা বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এসব উঁচুতলার ভবন বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ অবরুদ্ধ করে ফেলে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় আরবান ক্যানিয়ন এফেক্ট বলা হয়। যখন বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকে এবং আশপাশের যানবাহন ও বস্তি এলাকা থেকে ধোঁয়া নির্গত হয়, তখন এ উঁচু ভবনগুলোর কারণে বাতাস তা সরিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। ফলস্বরূপ দূষিত কণাগুলো ভূমির কাছাকাছি বাতাসে আটকে থেকে স্থানীয় বায়ুদূষণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

দূষণ অব্যাহত থাকলে এসব অভিজাত এলাকাও আকর্ষণ হারাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, সরকারকে যেকোনো মূল্যে ঢাকার পরিবেশের মান উন্নত করতে হবে। গুলশান-বনানীর মতো এলাকায় বায়ুদূষণের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ধোঁয়াকে দায়ী করছেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছু আটকাতে পারি, বাতাস তো আটকাতে পারি না। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা এ দূষণ মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এর ফলে আমাদের আয়ু কমে যাচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দূষণ কমানো সম্ভব। আর তা করতে হলে বিআরটিএর দুর্নীতি কমাতে হবে। ঢাকায় এত ফিটনেসবিহীন, কালো ধোঁয়া নিঃসরণকারী গাড়ি চলছে। তাই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শুরুতেই এ বিষয়ে ভাবতে হবে।’

যানবাহনের ধোঁয়ার পাশাপাশি চলমান নির্মাণকাজ থেকেও এসব এলাকায় দূষণ ছড়াচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্মাণকাজে ধুলাবালি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা না নেয়ায় আশপাশের বাতাস দূষিত হচ্ছে। আইনে এসব ব্যবস্থা নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে যথাযথ প্রয়োগ নেই।

বনানী সোসাইটির সভাপতি শওকত আলী ভূঁইয়া (দিলন) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুলশান-বনানীতে প্রচুর নির্মাণকাজ হচ্ছে। বিদেশে এসব কাজে কয়েক স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশে আইনে থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। কড়াইল বস্তিও আশপাশের দূষণে ভূমিকা রাখে। সেখানকার বাসিন্দাদের মানসম্মত জীবন নিশ্চিত করতে ভালো হাসপাতাল ও পরিচ্ছন্ন বাজারের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্জ্য পোড়ানোর ক্ষেত্রেও দুই সিটি করপোরেশনকে সঠিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ নিলে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ পুরো ঢাকাকে বায়ুদূষণমুক্ত রাখা সম্ভব।’

সার্বিক বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ-১) সিদ্ধার্থ শংকর কুণ্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এ বিষয়ে একটি কমিটিও রয়েছে। কমিটির আসন্ন সভায় বিস্তারিত আলোচনা করে পরবর্তী নীতি ও করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’