জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের (বিবিএন) মধ্যে আঞ্চলিক ঐক্য জোরদার এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত, উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩১) সামনে রেখে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ (সিজেএ-বি), ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, সচেতন সংস্থা, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (এসডিএস), এবিসিডি ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি নাগরিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও সিজেএ-বির সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা।

স্বাগত বক্তব্যে মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা এলডিসি উত্তরণ কোনোভাবেই জলবায়ু ঝুঁকি কমিয়ে দেয় না। এমনকি জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ায় না। ভুটান এরই মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে। বাংলাদেশ ও নেপাল নিজ নিজ উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তিনটি দেশই উল্লেখযোগ্য জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। তাই আগামীতে এই দেশগুলোর সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সম্মিলিত অ্যাডভোকেসি এবং সমন্বিত অভিযোজন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’

এসডিএসের নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণকে কোনোভাবেই জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা থেকে উত্তরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। উন্নয়ন অগ্রগতির অজুহাতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন সহায়তা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, উন্নত দেশ ও বহুপক্ষীয় জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।’

ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুল বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা ও বেঁচে থাকার অধিকার উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না।’ বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ তুলে ধরতে যৌথ অ্যাডভোকেসির আহ্বান জানান তিনি।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘কপ৩১ ও পরবর্তী সময়ে ন্যায্য অভিযোজন সহায়তা এবং জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ও জরুরি।’

উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, ‘অভিযোজন ও প্রশমন জলবায়ু কার্যক্রমের পরিপূরক দুটি স্তম্ভ। অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এটি উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার অংশ।’

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। তিনি প্রচলিত উন্নয়ন সূচকের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যৎমুখী জলবায়ু ঝুঁকিকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, সচেতন ফাউন্ডেশনের হাবিবুর রহমান, রিভারাইন পিপলের মো. আনোয়ার হোসেন, সচেতন সংস্থার সাকিলা পারভীন, মৃত্তিকা সমাজ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের খাদিজা খানম, সিপিআরডির গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শেখ নূর আতায়া রাব্বি প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে কপ৩১ ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের স্বার্থ সুরক্ষায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তিনটি নীতিগত দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা, ন্যায্যতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে সহায়তা নির্ধারণ; এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং এ অর্থায়নে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে টেকসই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা; পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে অভিন্ন আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি ও আলোচনাভিত্তিক কর্মসূচি গড়ে তোলা।