৩৫ বছর আগের কথা। ১৯৯১ সালে ত্রিমোহনী বিডি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হন বরমী ডিগ্রি কলেজে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশও নিয়েছিলেন। তবে উচ্চতর গণিতে অকৃতকার্য হওয়ায় থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন। এরপর জীবিকার তাগিদে কেটে যায় ৩২ বছর। কিন্তু মনের ভেতরে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার ইচ্ছাটা বেঁচে ছিল। তাই পরিবারের কাউকে না জানিয়ে দীর্ঘ ৩২ বছর পর সেই স্বপ্ন পূরণে আবারো ফিরেছেন পরীক্ষার হলে। ৫৪ বছর বয়সে সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৬৩ পেয়ে সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মো. আনোয়ার হোসেন মজনু কাইয়া। তার এ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং বয়সের বাধা পেরিয়ে নতুন করে শুরু করার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।

জানা গেছে, মজনু কাইয়া শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ভিটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৭৩ সালে জন্ম নেয়া মজনু এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। বরমী ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উচ্চতর গণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর পড়াশোনা ছেড়ে শুরু করেন মুরগি পালনের ব্যবসা। সংসার ও ব্যবসার দায়িত্ব সামলাতে কেটে যায় ৩২ বছর। তবে অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন শেষ করার ইচ্ছা রয়ে যায় তার মনে।

৫৪ বছর বয়সে এসে আবারো পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন মজনু। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে তিনি গাজীপুরের পূবাইল টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। একদিকে পোলট্রি ব্যবসা, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব সামলে নতুন করে শুরু করেন পড়াশোনা। অবশেষে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৬৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে তিনি ভিটিপাড়া কোব্বাত হামিদ কাইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মজনু জানান, ৫৪ বছর বয়সে আবার পরীক্ষায় বসার সাহস দেখানোয় এলাকার অনেকে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখন তার লক্ষ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা। ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো বয়সেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ছেলের সাফল্যে আনন্দিত মা আনোয়ারা খাতুন। মজনুর সাবেক শিক্ষক ও সহকর্মীরাও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার সাবেক শিক্ষক ভিটিপাড়া কোব্বাত হামিদ কাইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএম হাবিবুর রহমান জানান, ৫৪ বছর বয়সে মজনুর এইচএসসি পাসের খবর তাকে আনন্দিত করেছে। বয়স কিংবা পরাজয় শিক্ষার পথে বাধা নয়। তার এ সাফল্য অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রজব আলী মোড়ল বলেন, ‘লেখাপড়ার সঙ্গে বয়সের সম্পর্ক নেই। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই আবার পড়াশোনা শুরু করে পরীক্ষায় অংশ নেয়া সম্ভব।’

বিদ্যালয়ের সভাপতি কফিল উদ্দিন কাইয়া বলেন, ‘মজনু বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার আবার পড়াশোনা শুরুর বিষয়টি জানা ছিল না। শিক্ষার কোনো শেষ বা বয়স নেই। মজনুর অর্জন তা আবারো প্রমাণ করেছে।’

শ্রীপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ বিরতির পর ৫৪ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করে মজনু অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার সাফল্য দেখে অন্যরাও উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী হবেন বলে আশা করি।’