প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের আট বিভাগের ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা মনে করেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় প্রায়ই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ঘটনা ঘটে। এ ধরনের তথ্যগত বিভ্রান্তি শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা থেকেই উদ্ভূত। এটি শিক্ষা খাতে পরিচালন দুর্বলতাকে সামনে আনছে। আবার এ কারণে প্রাথমিক শিক্ষায় সম্পদের সুষম বণ্টন ও যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ যে ব্যাহত হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। এর সমাধান করতে হলে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়া চাই, যেখানে সব শিক্ষার্থীর তথ্য নথিভুক্ত থাকে এবং প্রয়োজনমাফিক তা ট্র্যাক করা যাবে।

শিক্ষার্থীর তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ ব্যক্তিভিত্তিক ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ভারতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস (ইউডাইস প্লাস) ব্যবস্থায় ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক শিক্ষার্থী পরিচিতি নম্বর তৈরির পাশাপাশি বিদ্যালয়, ব্লক, জেলা ও রাজ্য পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে একই শিক্ষার্থীর একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি দেখানো, ঝরে পড়া শনাক্ত করা এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি অনুসরণ করা সহজ হয়। দেশটিতে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অটোমেটেড পার্মানেন্ট একাডেমিক অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রি’ (আপার) নামে ১২ সংখ্যার স্বতন্ত্র পরিচিতি ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডেও স্কুলশিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহে নিয়মিত স্কুলশুমারি পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীভিত্তিক তথ্য জমা দিতে হয় এবং সরকারি তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় যাচাইয়ের মাধ্যমে অসংগতি ও অস্বাভাবিক তথ্য শনাক্ত করা হয়। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য সংশোধন না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়কে ব্যাখ্যা দিতে হয়। দেশটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন নির্ধারিত হওয়ায় তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

এদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর পেছনে সরকারি উপবৃত্তি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রবণতা, বিদ্যালয় একীভূতকরণ এড়ানোর বিষয়গুলো উঠে এসেছে ওই পর্যবেক্ষণে। তবে যে কারণেই এমনটি ঘটুক, প্রকৃত তথ্য গোপন করে বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সুফল বয়ে আনবে না। তাই সরকারেরও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথা ভাবা প্রয়োজন।

যেমন জন্মনিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর তৈরি করা যেতে পারে। তবে শুধু পরিচিতি নম্বর তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সেগুলোও হালনাগাদকৃত তথ্য হতে হবে। একই শিক্ষার্থী একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থাকলে তার প্রকৃত বিদ্যালয় কোনটি, নিয়মিত উপস্থিতি কেমন এবং কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে কিনা, তা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

এক্ষেত্রে শুরুতে মাঠপর্যায়ের তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। তবে লোকবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণেই দেখা গেছে, ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মকর্তার মাসে ১০টির বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শনের সক্ষমতা নেই। অথচ ৫৮ শতাংশ কর্মকর্তার ওপর ৫০টির বেশি বিদ্যালয় তদারকির দায়িত্ব রয়েছে। এ অবস্থায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তাই বিদ্যালয়ের সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় পরিদর্শক নিয়োগ ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে হবে। ডিজিটাল তথ্যের সঙ্গে সরজমিনে উপস্থিতি যাচাইয়ের সমন্বয় ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর সঙ্গে সরকারি অর্থ বা সুবিধা আত্মসাতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে পুরো তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়ে গেলে সশরীরে গিয়ে তদারকির প্রয়োজনও কমে আসবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।

অন্যদিকে কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয় একীভূত করার সিদ্ধান্তও কেবল নির্দিষ্ট একটি সংখ্যার ভিত্তিতে নেয়া সমীচীন নয়। কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম থাকার কারণ কী সেটিও অনুসন্ধান করা উচিত। জনসংখ্যা হ্রাস, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের অসুবিধা কিংবা আশপাশে বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এর কারণ কিনা তা দেখতে হবে। তাই বিদ্যালয়ের প্রকৃত চাহিদা, দূরত্ব, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনসংখ্যার প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদ্যালয় একীভূতকরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর ওপর ভিত্তি করেই শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন, শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, উপবৃত্তি এবং অন্যান্য সরকারি বরাদ্দ নির্ধারিত হয়। ফলে কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বেশি দেখানো হলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সম্পদ বরাদ্দের ঝুঁকি থাকে। বিপরীতে যেখানে প্রকৃত শিক্ষার্থী বেশি, সেখানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামো বরাদ্দে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মান মূল্যায়নও কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। আর সেই উদ্যোগের শুরু হতে পারে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা।