বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার আউশের উৎপাদন কমেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আলুর উৎপাদন কমেছে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় এবার বোরোর উৎপাদনও কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়, ১ দশমিক ৪ শতাংশ। আবহাওয়ার বৈপরীত্য এবং উপকরণ সংকটের কারণে গত বোরো এবং আউশ ধানের উৎপাদন কমেছে। আলুর উৎপাদন কমেছে মূলত নিম্ন বাজার মূল্যের কারণে।
‘ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার’ (ইউএসডিএ)-এর ২০২৬ সালের সর্বশেষ ‘গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট’ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন কমতে পারে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টন। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সার ও জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি মৌসুমের আমন ধানের উৎপাদন এবং সামনের গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদন কমতে পারে। তাছাড়া ২০২৬-এর শেষে এবং ২০২৭-এর শুরুতে এল নিনোর প্রভাবে খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকায় কমতে পারে সামনের বোরোর উৎপাদন। ফলে ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে চালের আমদানি ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টনে দাঁড়াতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে গমের আমদানি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন হতে পারে। কিন্তু পোলট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশুর খাদ্য চাহিদা বাড়ার কারণে ভুট্টার আমদানি বেড়ে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টনে দাঁড়াতে পারে। পক্ষান্তরে দেশে আর্থিক সংগতির অভাবে এবং খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে পর্যাপ্ত আমদানি সম্ভব নাও হতে পারে। তাতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যেতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
এফএওর ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাশিফিকেশন’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ উচ্চ মাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীতার মুখোমুখি হয়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকবে। এটি পূর্ববর্তী মে-আগস্ট প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এক্ষেত্রে সার্বিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর নেতিবাচক অভিঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যসামগ্রীর উচ্চমূল্যের প্রভাব প্রচ্ছন্নভাবে জড়িত।
এদিকে দেশের গরিব মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা ও পুষ্টির জোগান দেয়া এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্থবিরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমছে। বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। জ্বালানি সংকট ও অর্থাভাবে অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাতে বেকারত্ব বাড়ছে। অন্যদিকে সরকারের ব্যয় লাগাতার বাড়ছে, কিন্তু সে অনুপাতে আয় বাড়ছে না। ফলে সরকারের দেনা বাড়ছে। সাধারণ মানুষের ওপর কর, ভ্যাট ও সার্ভিস চার্জ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জনকল্যাণমূলক ব্যয় হ্রাস করা হচ্ছে। ফলে গরিব মানুষের জীবনমান কমে যাচ্ছে। তাদের আর্থিক দৈন্য ও ভোগান্তি বাড়ছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ধীরগতির পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। গত অক্টোবরে প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ হয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী দেশে এত দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল সর্বশেষ ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২ দশমিক ৫ (৩ দশমিক ১১ শতাংশ বিকল্প পরিমার্জিত হিসেবে) শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারীর সময়ও সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছিল। আইএমএফের মতো বিশ্বব্যাংক এবং এডিবিও চলতি অর্থবছরের জন্য নিম্ন মাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বাভাস দিয়েছে। ওই দুটো প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হচ্ছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪ এবং ৪ শতাংশ। অন্যদিকে দেশের মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে বেড়ে যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। আগামী দিনগুলোতে তা বাড়তে পারে। তাতে মানুষের জীবনধারণের ওপর চাপ বাড়বে। বিবিএসের সার্ভে অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ বেঁচে আছে ধারদেনা করে। গ্রামে এ হার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ। শহরে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ। সার্বিকভাবে দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ ঋণগ্রস্ত। আয়ের চেয়ে তাদের ব্যয়ের পরিমাণ বেশি। ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। গরিব মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬ সালের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে এ হার ২৮-২৯ শতাংশ। তাছাড়া প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বব্যাংক জানাচ্ছে, বর্তমানে অতিদারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৯ থেকে ১০ দশমিক ১ শতাংশে বেড়েছে। নিম্ন মধ্য আয়ের মানুষগুলো যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এভাবে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল শ্রমবাজার, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্থরগতি। প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে বাংলাদেশ উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের লাল তালিকাভুক্ত। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৬ মাস ধরে মজুরি বাড়ার হার ছিল মূল্যবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। তাতে মানুষের দারিদ্র্য ও কষ্ট বেড়েছে। এ সময় গরিব মানুষের জন্য ব্যাপক মাত্রায় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গরিব মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার থাকলেও তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। এরই মধ্যে অনেকের বয়স্ক ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। টিসিবির কার্ড স্থগিত করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ভাতা অনেক ক্ষেত্রে দেয়া হচ্ছে না। কৃষি উপকরণের মূল্য বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। অন্যান্য সেবার মূল্যও বেড়েছে। এমনকি এনজিও প্রদত্ত গরিব মানুষের ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদের টাকার ওপরও ট্যাক্স বসেছে। এ অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।
বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের ত্রাণ ও সহায়তা বৃদ্ধির জন্য সরকারের সার্বিক আয় বাড়ানো প্রয়োজন। কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিচালন ব্যয় সংকুচিত করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব খাতের আয় তেমন বাড়নো যাচ্ছে না। অথচ ব্যয় বৃদ্ধির হার বাড়ছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। ফলে সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারের ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণের তুলনায় তা অনেক বেশি। গত ২৪ সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ১১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রতি মাসে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮-৯ হাজার কোটি টাকা। এরই মাঝে অপেক্ষকৃত কম প্রয়োজনীয় বেশি সংখ্যক বিমান কেনার জন্য ব্যয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে প্রায় লাখ কোটি টাকার। সরকারি কর্মচারীদের অতিমাত্রায় বেতন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন হচ্ছে আরো লক্ষাধিক কোটি টাকার। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছিল, সেই সরকার তা কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিল। বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমান নির্বাচিত সরকার একটা নতুন কমিশন গঠন ও নিরপেক্ষভাবে তা আর্থিক সংগতির সঙ্গে মূল্যায়ন না করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তাতে দেশের প্রায় ৫ শতাংশ কর্মচারীকে খুশি করা সম্ভব হলেও বাকি ৯৫ শতাংশের সঙ্গে বড় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। সেটাকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করছে দেশের সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে প্রথম ধাপের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করার পর পরবর্তী ধাপগুলো স্থগিত করা উচিত। নতুন একটি পে কমিশন গঠন করে তা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
বাংলাদেশের বর্তমান নিম্ন মাত্রার জিডিপি প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের বন্ধ্যাত্ব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য রাজস্ব আয়ের গতি বৃদ্ধি, সরকারের পরিচালন ব্যয় হ্রাস, মানসম্মত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, গরিব মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরানো ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা উচিত। কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সার ও জ্বালানি সহজলভ্য করা এবং জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিকার হিসেবে কৃষকদের নগদ সহায়তা দেয়া উচিত। সাধারণ মানুষের ওপর কর ও ভেটের চাপ কমিয়ে তাদের জীবনে সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো উচিত। পুরনো কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অতিমাত্রায় (১০০-১৪২ শতাংশ) না বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ নেয়া উচিত। আগামীতে দেশের সার্বিক উন্নয়ন, ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা, খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য লাঘবে যত্নবান হওয়ার জন্য সরকারের কর্মসূচি যৌক্তিকভাবে রূপায়ণ ও তা দৃশ্যমান করা এখন সবচেয়ে বেশি কাম্য।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি) এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)










