ড. বিশ্বজিৎ চন্দ দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে। এর আগে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনেরও সদস্য ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুষদের ডিন, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ও সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন টিচিং অ্যান্ড লার্নিংয়ের (সিইটিএল) প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালকসহ বিভিন্ন একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ড. বিশ্বজিৎ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (সোয়াস) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা, সুশাসনসহ সার্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফ সুজন

বর্তমানে ইউজিসির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শুরুতেই দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই...

ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে যে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার হার খুব বেশি। আমাদের এত বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার দরকার নেই। সবাইকে বিএ-এমএ পাস করতে হবে এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নামের আগে শুধু একটি ‘ড.’ বসানোর জন্য পিএইচডি করারও দরকার নেই। একইভাবে শুধু ‘বিএ পাস’ কিংবা ‘এমএ পাস’ বলার জন্যও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি না। বরং কর্মমুখী শিক্ষার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত। উন্নত বিশ্বে শিক্ষকতা ও গবেষণা ছাড়া মাস্টার্স-পিএইচডি করার হার খুবই কম। সেখানে ও-লেভেল কিংবা এ-লেভেল শেষ করেই শিক্ষার্থীরা চাকরিতে প্রবেশ করে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তারা ক্যারিয়ারে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আমাদের দেশেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার। এসএসসি-এইচএসসির পর পরই একটি বড় অংশের কর্মক্ষেত্রে বা কর্মমুখী শিক্ষায় চলে যাওয়া উচিত। তাহলে তারা দেশের অর্থনীতি এবং একই সঙ্গে পরিবারের সচ্ছলতায় অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে। বর্তমানে দেশে বৃহৎ আকারের যে তরুণ প্রজন্ম রয়েছে, আমাদের উচিত তাদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে বড় অংকের রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব। এজন্য নতুন করে যারা বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে, আমরা তাদের নার্সিং, ভলকানাইজিংসহ কারিগরি ও চাকরির বাজারসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খুলতে উৎসাহিত করছি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কারিগরি বিষয়ে ডিপ্লোমা, সার্টিফিকেট কোর্স ও পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং বিদেশী ভাষাশিক্ষার কোর্সও চালু করতে পারে। জাপানসহ বিশ্ববাজারে এখনো প্রচুর পরিমাণে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। আমরা খুব সহজেই এ বাজার ধরতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কারিগরি শিক্ষার সনদ নিয়েও বেকার থাকতে হচ্ছে অনেক ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটকে। এর কারণ কী?

দেশের শিক্ষা খাতে গত কয়েক বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে, সেটি অনেকাংশেই সংখ্যাগত। আমাদের তো শুধু সংখ্যা বাড়ালে হবে না। গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটরা কী শিখে বের হচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। তারা আদৌ হাতে-কলমে শিখতে পারছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাব ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। পাঠদানের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক-প্রশিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এক ধরনের দূরত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের যে পদ্ধতি রয়েছে, সেখানে কিছু পরিবর্তন দরকার। ইন্টার্নশিপের সময়সীমা বাড়িয়ে সেটিকে এক বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী কারখানায় গিয়ে যদি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পায়, তাহলে বের হওয়ার পর তাকে বেকার থাকতে হবে না। ভালো পারফর্ম করতে পারলে ওই প্রতিষ্ঠানেই তার চাকরি হয়ে যাবে। ইন্টার্নশিপকে গুরুত্বসহকারে মূল ক্রেডিটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অর্থাৎ ডিগ্রি অর্জনের আগেই যেন একজন শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কাজ শেখা ছাড়াই কোনো শিক্ষার্থীকে সনদ দেয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বলতে চাই। সেটি হলো কারিগরি ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ছোট ছোট অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা অনেক ভালো পণ্য তৈরি করলেও সেটির পর্যাপ্ত ব্র্যান্ডিং নেই। যেমন, ধোলাইখালের মতো জায়গায় অনেক দক্ষ শ্রমিক রয়েছেন, তাদেরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এমনকি সেখান থেকেও দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক তুলে আনা সম্ভব। এ ধরনের ছোট ছোট ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোলাবরেশনে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প হেকেপের অধীনে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সে উদ্যোগগুলোর কতটুকু বাস্তবায়ন হলো?

যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছিল আমি বলব, সেগুলো খুব ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিছু উদ্যোগ সমন্বয়ের অভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আবার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কর্মবাজারের লক্ষ্যগত দূরত্বের ক্ষেত্রে একটি বিষয় আমার নজরে এসেছে। সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব বিষয়ে পড়ানো দরকার আছে। তবে কোন বিষয়ে কতসংখ্যক ভর্তি করাবে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। যেমন পুরনো অনেক বিভাগ রয়েছে, যেগুলোর এখন আর আগের মতো আবেদন নেই। সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। তবে সেসব বিভাগের আসন কমিয়ে আনা দরকার। আবার একইভাবে যেসব বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজারে চাহিদা রয়েছে, সেসব বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা দরকার।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে সিলেবাস হালনাগাদ না করার একটি অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনাদের পর্যবেক্ষণ ও পদক্ষেপ কী ধরনের?

বিশ্বব্যাপীই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তন ঘটছে সর্বত্রই। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি তাদের সিলেবাস নিয়মিত আপডেট না করে তাহলে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও নবতর জ্ঞান অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়বে। এজন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই একটি মানদণ্ড নির্দিষ্ট করে দিয়েছে কমিশন। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রোগ্রাম ও কোর্সগুলোর সিলেবাসের অনুমোদন ইউজিসি থেকে নিতে হয়। এক্ষেত্রে তাদের সিলেবাস অনুমোদনের মেয়াদ থাকে চার বছর। এরপর সেটি হালনাগাদ করে পুনরায় অনুমোদন করিয়ে নেয়া নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। যদিও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলেবাস দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে তাদের প্রোগ্রামের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন জাগে। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ সিলেবাসে পড়া শিক্ষার্থীদের সনদ নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সিলেবাস হালনাগাদ করার বিষয়টি সামনে আসে। এছাড়া নিয়মিত হালনাগাদ করলে আগের সিলেবাসের অপূর্ণতা ও ত্রুটিও দূর হয়। পাশাপাশি যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়ায় নতুনত্ব আসে। অথচ দুঃখজনক বিষয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলেবাস দিয়ে পাঠদান করছে। তাদের কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে মনে করিয়ে দিতে হবে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। আবার অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শুধু শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বিভাগ খোলার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলুন...

শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়; সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মানসম্মত শিক্ষকের একটি সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টি খুবই অবহেলিত। মাঝে মধ্যে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় না। এক্ষেত্রে সিইটিএলের কথা বলতে পারি। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও একাডেমিক লিডারশিপ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে দেশের ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা হয় সিইটিএল। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর সিইটিএলের উদ্যোগে সক্রিয়ভাবেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। যদিও কয়েক বছর ধরে অনেকাংশেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা সিইটিএলগুলোর অধিকাংশই। আমি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে সিইটিএলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এখন আমরা পুনরায় সিইটিএলকে সক্রিয় করার বিষয়ে কাজ করছি। আমরা সিইটিএলগুলোকে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সেগুলোকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের একটি রিজিওনাল হাবে রূপান্তর করার কথা ভাবছি। শিগগিরই এ বিষয়ে এক ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বিভাগের বিষয়ে বলতে গেলে কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি  দেখেছি সেখানে একসময় শুধু ভাষা, বাণিজ্য/ব্যবসায় শিক্ষা কিংবা প্রকৌশল বিভাগ ছিল। এখন একেকটি বিভাগ থেকে অনেকগুলো বিভাগ খোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন নতুন বিভাগ খোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। বরং একটি বিভাগ রেখে বিভিন্ন বিষয়ে মেজর রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্নাতকের প্রথম দুই বছর মৌলিক ও সাধারণ কোর্সগুলো পড়ার পর শেষের দুই বছর বিশেষায়িত কোর্সে পড়ানোর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রোগ্রাম খোলা যেতে পারে। আপনি দেখবেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি, সংস্কৃত, পালি, ফার্সি ভাষা বিভাগ থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তরের সনদ নিয়ে বের হয়েও ঠিকমতো ডিগ্রি-সংশ্লিষ্ট ভাষায় লিখতে বা বলতেই পারছে না এমন গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এটা হাস্যকর বিষয়। আরবি, ইংরেজি, ফার্সি কিংবা পালির মতো বিষয় যদি আপনি বাংলা মাধ্যমে পড়েন, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হচ্ছে? নতুন বিভাগ অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরো সতর্ক থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষক পদ সৃষ্টির জন্যই বিভাগ খোলা হচ্ছে। ওয়ার্কলোড বিবেচনায় না নিয়ে শিক্ষকের পদসৃষ্টির বিষয়ে অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আরো সতর্ক হতে হবে। কেননা দেখা যাচ্ছে অনেক বিভাগের শিক্ষকরা এক-দুটির বেশি কোর্স পড়ান না। অনেক শিক্ষক পড়ানোর জন্য কোর্সই পান না। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুমোদন পাওয়ার পর এমন এমন বিষয় পড়াতে চায়, যেগুলোর চাকরির বাজারে তেমন কোনো চাহিদা নেই। তারা জাতীয় স্বার্থ কিংবা শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের কথা না ভেবে নিজেদের সুবিধামতো বিভাগ খুলতে চায়। যদিও আমাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো কর্মমুখী শিক্ষা দেয়া।

গত এক দশকে কয়েক ডজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দেশে কি এত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আদৌ প্রয়োজন রয়েছে?

বর্তমানে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। এর মধ্যে অনেক জেলাতেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একটি জেলায় একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি না। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই রয়েছে ১০৭টি। আমি মনে করি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার রাশ টেনে ধরার এখনই সময়। এখন শুধু যেসব জেলায় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব জেলা ছাড়া অন্য কোনো স্থানে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার যৌক্তিকতা নেই। আর যদি দেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করবে এমন কোনো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আসে, সেটি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এত বিশ্ববিদ্যালয় না করে আমরা বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট করতে পারি। অথবা বিশেষায়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ডিগ্রি প্রদানের সুযোগ করে দিতে পারি।

বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রকাশনার ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গবেষণা ছাড়া গুণগত উচ্চশিক্ষা কতটুকু সম্ভব?

পাবলিক-প্রাইভেট দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণার চিত্র খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে নামকাওয়াস্তে এমফিল-পিএইচডির নামে যে গবেষণা করা হচ্ছে, সেগুলোর মান নিয়ে অনেক বড় প্রশ্ন রয়েছে। গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান ছাড়াই এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। আর সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না এ কথা ঠিক নয়। শীর্ষস্থানীয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো গবেষণা হয়। এমনকি কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরর তুলনায় ভালো গবেষণা হয়। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য বিদেশ থেকে ফান্ডও পাচ্ছে। তবে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণার অবস্থা নাজুক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত নিজস্ব উদ্যোগে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গবেষণা কাজকে প্রকাশনায় রূপ দেয়া। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু গবেষণা হলেও সেগুলো প্রকাশনায় আনা হচ্ছে না। গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেয়া না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও প্রকাশনায় নিজেদের একটি অবস্থান তুলে ধরতে পারলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে সরকারি সহায়তা পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে সংখ্যা বিবেচনায় না নিয়ে গুণগত মানে বিচার করতে হবে।

প্রায় সময়ই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট নিয়ে দ্বন্দ্ব-বিরোধের কথা শোনা যায়। এর পেছনে কী ধরনের কারণ রয়েছে?

আসলে ট্রাস্টিদের দ্বন্দ্বটা মূলত স্বার্থের দ্বন্দ্ব। এক্ষেত্রে সবার আগে ট্রাস্ট বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকাটা জরুরি। ট্রাস্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী, ট্রাস্ট ক্রিয়েটর ও ট্রাস্টি ট্রাস্ট থেকে কোনো ধরনের সুবিধা নিতে পারবেন না। ট্রাস্টিরা প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করবেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টের ক্ষেত্রে এর সুবিধাভোগী হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও সেখানকার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি সূত্রে সুবিধাভোগী। এখন ট্রাস্টের মূল দর্শন ধারণ করলে ট্রাস্টিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কোনো কারণ নেই। দ্বন্দ্ব তখনই হচ্ছে, যখন ট্রাস্টিদের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের বিষয়টি সামনে আসছে। এখন দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা অনিয়ম করে আর্থিক সুবিধা নেন, বিদেশে টাকা পাচার করেন এমন অনেক ঘটনায় আমরা তদন্তও করেছি। ফলে এসব কারণে দ্বন্দ্ব-বিরোধ হচ্ছে। আর্থিক সুবিধা না নিলে কোনো দ্বন্দ্ব হতো না। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে আইনের আরো কঠোর প্রয়োগ দরকার।

আরেকটি বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আচার্য কর্তৃক নিযুক্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও ফাইন্যান্স কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া দরকার। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিদের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। তারাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর পর্ষদ। এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সিদ্ধান্ত যদি বিওটির মাধ্যমে অনুমোদন করাতে হয়, তাহলে সেটি আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না। সেটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ক্রীড়নকে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে আমি বলব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর একটি নির্দিষ্ট সময় পার হলে সেখানে বিওটির ক্ষমতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হলে সেখানে বিওটির আর প্রয়োজন থাকে বলে মনে করি না। তারা প্রতিষ্ঠাতার সম্মান নিয়ে থাকবেন। আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রাইভেটের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই চলতে পারে। সেখানকার সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের মতো বডিগুলোর মাধ্যমে সব বিষয়ের অনুমোদন নিতে হবে। এটি বাস্তবে রূপ দিতে পারলে দেখা যাবে, শুধু প্রকৃত শিক্ষানুরাগীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগ করবে। কেউ বাণিজ্যিক কিংবা আর্থিক সুবিধার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে না।