আঙুর ফল কখন টক হয় তা আমরা জানি। চিনির কথা কি জানি? চিনি কখন টক হয়? বলাই যায় এ মুহূর্তে চিনিও টক। কারণ চিনিতে হাত দেয়ার জো নেই। একশত বিশ টাকা এক কেজি চিনি। তাও খোলাবাজারে আপসে চিনি পাওয়া যায় না। মানুষ বোঝে না হঠাৎ করে চিনির দাম এত বাড়ল কেন? কী ঘটল যে চিনির দাম দেড়-দ্বিগুণ হলো? যুদ্ধ তো শুরু হয়েছে অনেক আগে। যুদ্ধের প্রভাবে চিনির দাম হঠাৎ বেড়েছে তা বলার কারণ দেখি না। অথচ বাড়ছে। যেমন বাড়ছে চালের দাম। বাড়ছে তো বাড়ছেই। আজ কার্তিক মাসের ২৪ তারিখ। দুদিন বাদেই অগ্রহায়ণ মাস। মাঠ ভর্তি আমন ধান, আমনের মৌসুম এসে গেছে। অনেক জায়গায় আমনও উঠেছে। সরকারের গুদামে চাল আছে। মজুদ ভালো। নিয়মিত আমদানি হচ্ছে। সরবরাহেও তেমন ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। মোকামে গেলে দেখা যায় দোকান ভর্তি চাল। তাহলে কেন চালের দামে এত বৃদ্ধি। আগের দিনে কার্তিক মাসকে খড়া কার্তিক বলা হতো। এই সময় ‘মঙ্গা’ নেমে আসত, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। ভিক্ষার অভাব হতো। ভাতের অভাব হতো। ভাতের মাড়ও পাওয়া যেত না। সেই ‘মঙ্গায়’ কত লোক মারা যেত, উপোষ থাকত। আজ আর এ অবস্থা নেই। উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্যশস্য আমদানি হচ্ছে, সরকার স্বল্পমূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ করছে, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। অতএব, ‘মঙ্গা’ এখন বিলীন। শব্দটির সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নয় আজ। এমন একটা পরিস্থিতিতে প্রতিদিন চালের দাম বাড়বে কেন? শুধু কী চাল, বাড়ছে মাছের দাম। অথচ এখন মাছেরও মৌসুম। শীতকালে খেয়ে-দেয়ে আরাম। তখন মাছের দাম পড়ে, শীতকালীন সবজির দাম কমে। কিন্তু দেশে মাছের বাজারে মাছের দামেও ঊর্ধ্বগতি, সবজির দামেও ঊর্ধ্বগতি। এ যেন ঊর্ধ্বগতির এক আজব দেশ। পালাক্রমে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ে। আজকে পেঁয়াজের দাম, কালকে সয়াবিনের দাম, পরশু ডিমের দাম, রুটির দাম, ফলের দাম। কোনো বিরাম নেই। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আমলে (১৯৫৭-৭১) আমরা রাস্তায় মিছিল নিয়ে বেরোতাম। চালের দাম, তেলের দাম কমাতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে। দাম তো কোনোদিন কমেইনি, বরং পণ্যমূল্য সবসময়ই বাড়ে। অজুহাতের শেষ নেই। সরবরাহ সংকট, বন্যা-খরা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, রোদ-বৃষ্টি, হরতাল-ধর্মঘট, কত কী ব্যবসায়ী ভাইদের অজুহাতের কোনো শেষ নেই। তাদের হাতের কাছে শত অজুহাত। বাজেটের অজুহাত, করবৃদ্ধির অজুহাত। এবার চিনির মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অজুহাত কী? সরবরাহ সংকট? না দেশে চিনির কোনো ঘাটতি নেই। অপরিশোধিত চিনি আছে গুদামে কয়েক মাসের। আগেরই আমদানি। দাম যা ‘পড়ার’ পড়েছে।

ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যা পড়ার আগেই পড়েছে। তাহলে কেন বৃদ্ধি? ব্যবসায়ীরা বলছেন দাম বাড়ছে কারণ অপরিশোধিত চিনি খাওয়ার যোগ্য চিনি করা যাচ্ছে না। কারখানা চালু থাকছে না। বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। দিনের অর্ধেক সময় কারখানা চালু থাকে। বাকি সময় বন্ধ। অতএব, চাহিদা অনুযায়ী বাজারে চিনি সরবরাহ করা যাচ্ছে না? এ কথা শুধু চিনির বেলায় সত্য হবে কেন? বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা এখন সাধারণ একটি সমস্যা। তা সবার মধ্যেই। তাহলে হঠাৎ করে আলাদাভাবে চিনির মূল্যবৃদ্ধি কেন? সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সয়াবিন ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার কোটি টাকা বানিয়েছে। পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা নিচ্ছে প্রতি বছর। চালের ব্যবসায়ীরা নিচ্ছে প্রতিদিন। তাহলে চিনির ব্যবসায়ীরা কী দোষ করল? একটা ‘মান-সম্মানের’ প্রশ্ন আছে না? চিনির দাম না বাড়লে চিনির কদর, চিনির ব্যবসায়ীদের কদর হবে কীভাবে? সাধারণ মানুষ এভাবে একটা ব্যাখ্যা দিতে চাইলেও খবরের কাগজে দেখলাম ব্যবসায়ীদের অনেক ব্যাখ্যা তারা বলছেন বাজার অস্থির থাকলে তাদের কোনো লাভ নেই। স্থিতিশীল বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে সুবিধা। অস্থিতিশীল বাজারে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হন। অনেকে নিজের পুঁজি হারান। ব্যবসা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।

দৈনিক বণিক বার্তার একটি রিপোর্ট থেকে (৬.১১.২২) ব্যবসায়ীদের অনেক দুঃখের কথা জানা যায়। তাদের বক্তব্যের মধ্যে একটা ‘সুর’ আছে। ‘সুরটা’ হচ্ছে তারা নির্দোষ। এ পরিস্থিতির জন্য তারা সাধারণভাবে দায়ী না। তাহলে কারা দায়ী? দায়ী এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। চিনির ব্যবসা থেকে খাতুনগঞ্জে অনেকে হচ্ছেন লাভবান, অনেকে হচ্ছেন ফতুর। হতে পারে তা। অভাবের দিনে, সংকটের দিনে সবাই সুযোগ নিতে পারে না। যাদের শক্তি আছে, প্রভাব আছে, নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে তারাই লাভবান হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এর দায়ভার বহন করতে হয় সব ব্যবসায়ীকে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় খুব কম। কিন্তু মানুষ সরকারকেই দোষারোপ করে বেশি। ‘অভিশম্পাতও’ দেয়। সরকার তখন উপায়ন্তর না দেখে ‘অ্যাকশনে’ নামে। এই ‘অ্যাকশন’ অবশ্যই প্রশাসনিক ‘অ্যাকশন’। পুলিশ ও প্রশাসন দিয়ে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। পণ্যের গুদাম পরীক্ষা করা হয়। খাতাপত্র ‘চেক’ করা হয়। অনেক সময় মামলা-মোকদ্দমাও করা হয়। সভা-মিটিং করা হয়। অনেক সময় মন্ত্রী মহোদয় মাঠে নামেন। ব্যবসায়ীদের অনুরোধ-উপরোধ করেন। দয়া করে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য অনুরোধ করেন। ‘হা হতোস্মি’। কিছুই ফল তাতে মেলে না। ব্যবসায়ীরা যা করার তাই করেন। মুনাফার জন্য যা করার তাই করেন। মুনাফা মানে কেউ কেউ বলেন, ‘অতি মুনাফা’ বা মুনাফাফোবিয়া। এ জায়গায়ই গণ্ডগোল। প্রথমত, মুনাফা কী? কত মুনাফা করলে তাকে বলা হবে ‘অতিরিক্ত মুনাফা’। কত মুনাফা করলে তাকে বলা হবে ‘মুনাফাফোবিয়া’। আমার জানা মতে, মুনাফার কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই। এমনিতে অ্যাকাউন্টিংয়ে মুনাফার একটা সংজ্ঞা আছে। একটা ‘গ্রস প্রফিট’, আরেকটা ‘নিট প্রফিট’। ক্রয় মূল্য ও বিক্রয় মূল্যের তফাতকে সাধারণভাবে গ্রস প্রফিট বলা হয়। আর গ্রস প্রফিট থেকে প্রশাসনিক খরচ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তাকেই বলা হয় নিট প্রফিট। এখন এই গ্রস প্রফিট ও নিট প্রফিট কত হলে তা ন্যায্য হবে, কত হলে তা অন্যায্য হবে? আছে কি আইন? মজুদকরণ, কেনা-বেচা ইত্যাদির ওপর সাধারণ কতগুলো বিধিনিষেধ দেয়া আছে। পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কতগুলো সাধারণ বিধিনিষেধও আছে। এসবের বিচার আচারও আছে। কিন্তু এসব বিধিনিষেধ এত অবাস্তব যে তা পরিপালন করা খুবই কঠিন। বস্তুত এসব মেনে ব্যবসা করা যায় না। আবার এ সমস্যার আরেকটা দিক আছে। দেখা যাচ্ছে, বাজার অর্থনীতির কল্যাণে বিমানের ভাড়া আজ এক তো কাল আরেক। যতই যাত্রার দিন ঘনিয়ে আসবে, টিকিট থাকলে তার দাম ততই বাড়বে। নিশ্চয়ই চাহিদা-সরবরাহের যুক্তি এখানে প্রযোজ্য। সাধারণ ক্ষেত্রেও আমরা দেখি বাজার অর্থনীতির বাস্তবায়ন। এই যেমন রিকশা ভাড়া, সিএনজি ভাড়া। মুহূর্তে মুহূর্তে এসব বাড়ে-কমে। এখানে মুনাফার প্রশ্ন কি আছে? যা আছে চার্জের প্রশ্ন? এসব চার্জ, মুহূর্তে মুহূর্তে বদলীকৃত চার্জের আইনি ব্যাখ্যা কী? এটা কি তারা করতে পারে? এটা কি নৈতিক? জানি না সবই হচ্ছে চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে। বলা হয় এটাই বাজার অর্থনীতি। বাজার অর্থনীতি মানতে গিয়ে সরকার অনেক সময় ‘ওপেন মার্কেট অপারেশনে’ নামে। এটা এখন করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ঢাকাসহ সারা দেশে এই খোলাবাজারি ব্যবসা তারা করে। তারা কম দামে ন্যায্যমূল্যে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিক্রি করে। এতে মাঝেমধ্যে বাজারে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে। শত হোক মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও গরিব লোকের এ বাজারে যাওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না। তারা টিসিবির পণ্য কেনার জন্য লম্বা লম্বা লাইন ধরে। সাময়িক কিছুটা ফল পাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসবের ফল সামান্যই।

বাজার চলে বাজারের নিয়মে। এক শ্রেণীর ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ীরা টাকা কামায় দুই হাতে। সঞ্চয়-সম্পত্তি করেন সমানে। স্বাধীনতার পর থেকে যারা কেনা-বেচার ব্যবসায় লেগে আছে, তারাই অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে। ব্যবসা হোক, কলকারখানা হোক, বড় ব্যবসা হোক সবার ক্ষেত্রেই তা সত্য, তবে এর মধ্যে কেউ কেউ যে মার খায়নি তা বলা যাবে না। সাধারণ প্রবণতা অবশ্য ‘বৃদ্ধি, অতিবৃদ্ধি’, সম্পত্তির মালিকানা আর সম্পত্তির মালিকানা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে অর্থপাচার। এসব সবই চোখে দেখা বিষয়—বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই। এখানেই কথা। দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতাটা এই যে ‘মুনাফা, অতি মুনাফা’ থাকবে। সরবরাহ সংকট, ডলার সংকট, গ্যাস বিদ্যুৎ ঘাটতি, রোদ-বৃষ্টি-বন্যা-খরা ইত্যাদির মধ্যে কেউ কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করবে, যা দৃষ্টিগ্রাহ্য। সাধারণের চোখে যা জঘন্য অপরাধ। এবং আরো সত্য তা থামানোর কোনো ব্যবস্থা আমাদের হাতে নেই। তাহলে করণীয় কী? করণীয় সম্পর্কে একটা উদাহরণ দিই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একবার ব্যাংকারদের বলেছিলেন ‘বোনাস’ না নিতে। ব্যাংকাররা বললেন এটা তাদের পাওনা। তারা এর থেকে কেন বঞ্চিত হবেন? তা হবে না। তখন ওবামা বলেছিলেন ঠিক আছে এটা তোমাদের পাওনা, তাহলে জেনে রাখো সরকারেরও পাওনা আছে। তোমরা বোনাস নিলে আমি ৯০ শতাংশ বোনাস ‘ট্যাক্স’ হিসেবে কেটে নেব। বাংলাদেশে কি তা করা যায় না? আমরা ব্যবসায়ীদের লোভ, অতিলোভ থেকে বিরত করতে পারছি না। পারছি না তাদের অতি মুনাফা অর্জন থেকে বিরত রাখতে। এমতাবস্থায় সরকার তো ট্যাক্স করতে পারে। ট্যাক্সের ক্ষমতা সরকারের। সরকার প্রতি বছর ট্যাক্স কমাচ্ছে-বাড়াচ্ছে। কোথাও বাড়াচ্ছে, কোথাও কমাচ্ছে। সবই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। যদি তাই হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বেয়ারা যেসব ব্যবসায়ী মানুষকে ঠকিয়ে বাজার অর্থনীতির নামে অতিরিক্ত মুনাফা করছে তাদের ওপর কেন অতিরিক্ত ট্যাক্স বসাতে পারবে না। বর্তমান চিনির বাজারে খাতুনগঞ্জসহ কোন কোন কারখানার মালিক অতিরিক্ত মুনাফা করছে তা প্রশাসন জানে, ব্যবসায়ীরা জানে, কর কর্মকর্তারা জানে। তাহলে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ে বাধা কোথায়? উইন্ডফল গেইনসের ওপর ট্যাক্স অনৈতিক কিছু কি?

 

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক