করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় দেশে চলছে সীমিত পরিসরে লকডাউন। চলমান লকডাউনের আওতামুক্ত রাখা হয় দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পকে। ১৪ এপ্রিল থেকে আবারো ‘সর্বাত্মক ও কঠোর লকডাউন’ কার্যকর করার কথা। তাতে উৎপাদনমুখী কারখানা চালু রাখার অনুমতি মেলার কথা বলছেন উদ্যোক্তারা। সরকারের কয়েকটি দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের এক ভার্চুয়াল বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে এ অনুমতি মিলেছে বলে খবরে প্রকাশ। কারখানা সচল রাখার আশ্বাসের বিষয়টি নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য স্বস্তিকর। এখন যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করাটাই জরুরি।
দেশের প্রবৃদ্ধির মূল দুটি চালকের একটি পোশাক শিল্প। কিন্তু মহামারীর কারণে গত বছরও বেশ অনিশ্চয়তা ও ব্যবসায়িক মন্দায় কাটে খাতটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে গত বছরের মার্চে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করা হয়। অন্যদিকে দেশেও ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর মাসখানেক কারখানা বন্ধ ছিল। সে কারণে গত বছরের এপ্রিলে মাত্র ৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরে কারখানা খোলার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেয়া হলে ধীরে ধীরে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে থাকে। তথ্যমতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ২ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে, এটা ইতিবাচক।
বর্তমানে অধিকাংশ কারখানা ৭০-৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে বলে খবর মিলছে। কিছু কারখানার অবস্থা খারাপ থাকলেও সার্বিকভাবে অবস্থা স্বস্তিকর। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিও অনুকূল। কিছু দেশে স্থানীয় বিধিনিষেধ আছে সত্য; তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ টিকাপর্বে প্রবেশ করায় পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। আবার মানবাধিকার ইস্যুতে চীনের তুলার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক ক্রেতার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মিয়ানমারে চলছে অস্থিরতা। তাতে বাংলাদেশ অন্যদের তুলনায় ভালো ক্রয়াদেশ পাচ্ছে। সামনে ঈদ মৌসুম। স্থানীয়ভাবেও পোশাকের চাহিদা আছে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস অনেক কারখানায়ই ভরপুর কাজ থাকবে। এ অবস্থায় সর্বাত্মক লকডাউনে কারখানা সচল রাখার বিষয়টি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে উদ্যোক্তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রতিটি কারখানায় নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন উপযোগী পরিবেশ।
গত বছরে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। মার্চে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে পোশাক কারখানাও বন্ধ হয়েছিল। এর মধ্যে এপ্রিলের শুরুতে কারখানা খোলার খবরে হাজার হাজার শ্রমিক ঢাকার পথে রওনা হয়। বাস, ট্রেন না চলায় এসব শ্রমিক হেঁটেই পাড়ি দেয় মাইলের পর মাইল পথ। ঢাকায় ফিরে কারখানা বন্ধ দেখে আবার ফিরেও যায়। কিছুদিন পর কারখানা খুললে আবার এসে কাজে যোগ দেয় তারা। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরকেন্দ্রিক তৈরি পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন। তখন শ্রমিকের এ যাতায়াত সারা দেশে সংক্রমণ ছড়াতে ভূমিকা রেখেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের মত। আসন্ন লকডাউনে এখন কারখানা চালু রাখার অনুমতি প্রাপ্তি অতীত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে সহায়ক হবে বৈকি। এতে অর্থনীতিও ভালো থাকবে, আবার শ্রমিকের জীবিকা-কর্মসংস্থানও রক্ষা পাবে।
শুধু রফতানিমুখী পোশাক কারখানা, উৎপাদনমুখী অন্য শিল্পের কারখানাও চালু থাকবে। একই সঙ্গে এসব শিল্পের জন্য পণ্য পরিবহনও চালু থাকবে বলে খবর মিলছে। ফলে সড়ক ব্যবস্থা ও বন্দরের মাধ্যমে কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে অসুবিধা হবে না। বাজারে সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখা এবং অর্থনীতির গতিময়তার জন্য এটা প্রয়োজন। সুতরাং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দিকে কারখানা কর্তৃপক্ষকে বেশি জোর দিতে হবে।
সত্য যে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এক বছরে আমাদের অনেক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কারখানাগুলোয় কার্যক্রম চলছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে ঢিলেঢালাভাবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের খবর মিলছে। সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে এ ধরনের শিথিলতা পরিহার করা আবশ্যক। লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকে। সেক্ষেত্রে কারখানা সচল রাখা হলে শ্রমিকদের আনা-নেয়ায় মালিকদের নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা দরকার। অসুস্থ হলে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন সেন্টার করা যায় কিনা, সেটিও ভেবে দেখা যেতে পারে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে উৎপাদনযজ্ঞ অব্যাহত থাকুক—এটিই প্রত্যাশা।










