দুটো খবরের কাগজের দুটো খবর। একটি আমদানির ওপর, অন্যটি রফতানির ওপর। বলা বাহুল্য, রফতানি ও আমদানি অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আবার মিডিয়ারও প্রিয় বিষয়। প্রায় প্রতিদিনই এ দুটির ওপর খবর প্রকাশ হয়। লাখে নয়, কোটিতে নয়; হিসাব হয় ‘বিলিয়নে’। যে দুটি খবরের কথা বললাম তার একটির শিরোনাম ‘বাজারে এখন দেশী ফলের দাপট’। অন্যটির শিরোনাম ‘শরীয়তপুরের লাউ গেল সুইজারল্যান্ডে’। দুটি খবরের বা ঘটনার ব্যাখ্যা নানাভাবে হতে পারে, হবেও। তবে দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আমাদের কৃষির জন্য। একটি খবরে দেখা যাচ্ছে বিদেশী ফল, যথা আপেল, আঙুর, বেদানা, নাশপাতি, কমলা ইত্যাদি ফলের দাম অসম্ভব হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় ফলের চাহিদা বেড়েছে। কুল, কলা, আনারস, পেঁপে, বেল, সফেদা ইত্যাদি ফলের কদর বেড়েছে; চাহিদা বেড়েছে। ‘ঠেলার নাম নাকি বাবাজি!’ ঠেলা মানে মূল্যবৃদ্ধি। বিদেশী ফলের দাম, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি হ্রাসের ফলে বেশ বেড়েছে। এখন এসবের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। আগে এসব ফল রোগীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। আমরা ছোটবেলায় তা-ই দেখেছি। স্বাধীন বাংলায় ধীরে ধীরে বিদেশী ফলের চাহিদা বাড়ে। এর সম্পর্ক হয়তো ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। এখন ক্রয়ক্ষমতা কম, দাম বেশি; অতএব বিদেশী ফলের কদর কমেছে বা কমছে। এটা কি ভালো লক্ষণ?
কেউ বলবেন ভালো লক্ষণ, কেউ বলবেন না—মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। এমন একটা অবস্থা হয়েছিল কিছুদিন আগে। সেটা গরু ‘আমদানি’ বিষয়ক, বিশেষ করে ভারতীয় গরু আমদানি সম্পর্কিত। হঠাৎ করে ভারত থেকে গরু ‘আমদানি’ হ্রাস পায়। ভারত প্রকৃতপক্ষে গরু রফতানি করে না, আর আমরাও গরু আমদানি করতাম না। এ ব্যবসা চলত অবৈধভাবে। এর জন্য সীমান্তে সুন্দর ‘বিনিময়’ বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল। সীমান্তে ‘ক্যাশ’ ও ‘গোল্ডের’ লেনদেন হতো বেশি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের গরুর মাংসের চাহিদা মিটত বিপুলাংশে। এতে একটা ছেদ পড়ে কিছুদিন আগে। সীমান্তে প্রচণ্ড কড়াকড়ি এবং পশ্চিমবঙ্গে গরু চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ভারতীয় গরু ‘আমদানি’ বহুলাংশে হ্রাস পায়। এর ফল কী? ফল আমাদের জন্য ভালো হয়। আমাদের গরু উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। দেশীয় খামারিরা গরুর উৎপাদনে মনোযোগ দেন। বর্তমানে সরকারের তথ্য মতে গরুর মাংসের বড় চাহিদা দেশীয় গরুতেই মেটে। এমনকি দুধেও আমরা উপকৃত হই। চামড়ায় তো বটেই। তার মানে কী? আমদানি হ্রাসে, আমদানিতে নিয়ন্ত্রণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফল হয়। স্বনির্ভরতা আসে। আত্মনির্ভরশীলতা ফিরে আসে। মনে হচ্ছে সরকারের বর্তমান কঠোর আমদানি নীতির ফলে আমরা কিছুটা ভালো ফল পাব। ডলার সাশ্রয় এক কথা, বিপরীতে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি। আমাদের দেশীয় ফল অনেক ধরনের। এক আমই ডজন, ডজন ধরনের। মৌসুমে মৌসুমে নানা ফল আমাদের উৎপাদন হয়। বিদেশী ফলের কারণে এদের চাহিদায় চাপ পড়ে। আবার দেখা যায়, বিদেশী ফলে যেসব গুণ আছে আমাদের দেশীয় ফলেও সেই গুণ আছে। তাহলে বহু মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে ঢালাওভাবে আমরা বিদেশী ফল আমদানি কেন করব? সরকারের এ বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা দরকার। ফলমূল আমাদের পুষ্টি সরবরাহেও সাহায্য করে। পুষ্টিতে আমরা পিছিয়ে আছি। চাল দরকার, গম দরকার। কিন্তু পুষ্টির কী হবে? গরু মাংস যেমন অপেক্ষকৃত কম খরচে আমাদের পুষ্টি জোগায়, তেমনি ফলমূলও তাই করতে পারে। এবারের ডলার সংকটে ফলের বাজারে যখন একটা উল্টো ঢেউ উঠেছে তা জাগিয়ে রাখতে অসুবিধা কোথায়? ফলের মধ্যে কোনো কোনো ফল আবার রফতানিও হতে পারে। আম তো হতেই পারে। আনারস আমাদের প্রচুর ফলন হয়। কাঁঠাল, তরমুজে আবার থাকে জমজমাট। লিচুও কম যায় না। ইদানীং বেরিয়েছে ‘লটকন’। কুল-বরই হয়েছে অনেক ধরনের। এগুলো রফতানির কথা উঠবে না কেন? সরকার এসবের উৎপাদনে, বিপণনে এবং রফতানিতে মদদ দেবে না কেন? ফলের জন্য বিশেষ ধরনের ‘কোল্ডস্টোরেজ’ দরকার। তাতেও ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন দরকার। মোট কথা, দেশী ফলের দাপট ধরে রাখা দরকার। কিছুটা ভর্তুকি দিয়েও যদি এদের ফলন বাড়ানো যায় তাহলে ফল সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষমতার মধ্যেও আসতে পারে।
ফলের কথা প্রসঙ্গেই আসে শাকসবজির কথা। অনেক দিন ধরেই শুনছি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শাকসবজি রফতানি হচ্ছে। সরকারি তথ্যেও এ কথার সত্যতা মেলে। একটি খবরে দেখলাম, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউরোপের বাজারে সবজি রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৯১৩ টন। ফলের রফতানি কী নেই? না, ফলের রফতানিও হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ফল রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৬৫৯ টন। এর বেশির ভাগই হয়েছে যুক্তরাজ্যে। সাম্প্রতিক খবর হচ্ছে, বাংলাদেশের লাউ যাচ্ছে সুইজারল্যান্ডে। বলা দরকার, দৃশ্যত এসব ভালো খবর। কিন্তু কিছু কথা থাকতে পারে। যেমন শাকসবজি রফতানি হোক, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারের কী হবে? দেশের মানুষের চাহিদা মেটানোর কী হবে? দেশের মানুষ না খেয়ে যদি এসব রফতানি করে তাহলে তো এটা কোনো কাজের কথা হলো না। দেশের মানুষ যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি, দুধ-মাছ-মাংস খেতে পারে তার ব্যবস্থাও দরকার। রফতানি করলাম, আর দেশে এসব জিনিসে কেউ হাত দিতে পারল না—তা হবে কেন? এর মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা দরকার যাতে দেশের মানুষও খাবে, রফতানিও হবে। বস্তুত এ জায়গাতেই আমাদের আমদানি-রফতানি নীতি ঢেলে সাজাতে হবে। কিছুদিন আগেও একটা স্লোগান চালু ছিল। সেটা পোশাক শিল্পের উত্থানের আগের ঘটনা। তখন অনেকেই বলার চেষ্টা করতেন—‘এক্সপোর্ট অর পেরিশ’। অর্থাৎ রফতানি বৃদ্ধি করো, রফতানি বৃদ্ধি করো। রফতানিই বাঁচার পথ। তখন এ কথা সবারই মনে ধরে। সত্যিই তো রফতানি বৃদ্ধি করা দরকার। প্রথমে হয় কোটাভিত্তিক পোশাক রফতানি। করতে করতে আজ পোশাক রফতানিই আমাদের বড় ব্যবসা। একে অনেকেই শিল্প বলে চালিয়ে দেন যা প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান করতেন না। তিনি একে বলতেন। ‘দর্জি শিল্প’। বস্তুত তৈরি পোশাক ব্যবসা কোনো ম্যানুফ্যাকচারি ইন্ডাস্ট্রি নয়। এটা সেলাইভিত্তিক কারখানাই বটে। কিন্তু এ কারখানা বা শিল্পই এখন হয়ে উঠেছে দেশের এক নম্বর রফতানি আইটেম। বাকিগুলো নস্যি, যেমন হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং পাটজাত পণ্য ও পাট রফতানি। স্বাধীনতার পরপর ছিল কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য, চা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আমাদের প্রধান রফতানি পণ্য। এর বদলে আজকের দিনে আমরা বস্তুত এক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। চা রফতানি এখন হয় না। বরং আমদানি হয়। তার মানে কী? স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের রফতানি বাণিজ্য বস্তুত এক পণ্যনির্ভর। তাও এই পোশাক রফতানির অংক স্ফীতভাবে দেখানো হয়। দৃশ্যত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাণিজ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তা নয়। তৈরি পোশাক রফতানি করার জন্য প্রচুর কাঁচামাল আমাদের আমদানি করতে হয়। এর জন্য প্রচুর ডলার খরচ করতে হয় প্রতি বছর। এতে ‘নিট’ রফতানি এ খাতে কিন্তু কম হয়। ২০২২ সালের ২১ আগস্টের একটি খবরে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তৈরি পোশাক যত রফতানি হয়; তার ৩৯ শতাংশ আমদানি করতে হয় কাঁচামাল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র। অর্থাৎ মোট তৈরি পোশাক রফতানির মাত্র ৬১ শতাংশ ছিল আসল (নিট) রফতানি। খুবই প্রণিধানযোগ্য নিট রফতানির পরিমাণ ২০২১-২২ অর্থবছরে কমে হয় ৫৪ শতাংশ। ওই অর্থবছরে ৪ হাজার ২৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি হয়। এর রিপরীতে কাঁচামাল ইত্যাদি আমদানি করতে হয় ১ হাজার ২৮৬ কোটি ডলারের পণ্য। তার মানে কী? মনে হচ্ছে আমরা তৈরি পোশাক খাতে যে রফতানির পরিসংখ্যান দেখাই তা অত্যন্ত স্ফীত। অথচ মুশকিল হচ্ছে এটাই আমাদের গর্বের খাত। মাঝে দিয়ে অন্যান্য রফতানির কোনো খবর নেই। আমরা এক পণ্যনির্ভর রফতানি বাণিজ্য গড়ে তুলেছি। তাও আবার এ বাজার নির্ভরশীল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ওপর। বণিক বার্তার ২৬ ফেব্রুয়ারির একটি খবর থেকে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রেই পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের। এটা বাংলাদেশের মোট রফতানির ২০ শতাংশ। বোঝা যাচ্ছে, রফতানি বাজার হয়ে গেছে এক পণ্যভিত্তিক এবং একটি বিশেষ অঞ্চলে সীমিত। রফতানি, রফতানি স্লোগান দিতে দিতে যে আমরা ক্রমেই আমদানি বাণিজ্য মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়িয়ে ফেলেছি সে খবর কিন্তু গুরুত্ব পাচ্ছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এখন বলা হতে পারে ইম্পোর্ট অর পেরিশ। সাম্প্রতিক কালে আমরা আমদানির পরিমাণ অনেক বাড়িয়েছি। এখানেও আমরা দুই দেশ নির্ভরশীল। আমদানির প্রধানতম উৎস চীন এবং দ্বিতীয় উৎস ভারত। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরেই আমদানির পরিমাণ ছিল ৮২ বিলিয়ন ডলার। অথচ এর বিপরীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আর ২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল মাত্র ২১ বিলিয়ন ডলার। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। একটি খবরে দেখলাম, গড়ে বছরে আমাদের রফতানি হচ্ছে জিডিপির ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং আমদানির পরিমাণ ১৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আমদানি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে ‘ওভার-ইনভয়েসিং’ দায়ী বলে সবাই মনে করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকও তা স্বীকার করেছে। এখন আমদানি ঋণপত্র তদারকি করা হচ্ছে। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, রফতানি রফতানি বলে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছি। এমন অবস্থায় চাল, গম, চিনি, তেল, আটা, রসুন, ডাল পেঁয়াজ ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিপত্রের জন্য আমরাও আমদানিনির্ভর। এমন অবস্থায় সমগ্র আমদানি বাণিজ্যের পর্যালোচনা দরকার। কতটুকু প্রয়োজনের আমদানি আর কতটুকু অপ্রয়োজনীয় আমদানি। সবচেয়ে বড় কথা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের ফলে কত বিলিয়ন ডলার পাচার হয় তাও দেখা দরকার।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










