বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলে ‘থায়িদ্দার’ বলে একটা কথা আছে। এরা গ্রামাঞ্চলের ‘অবস্থাপন্ন’ লোক, ধনী লোক। এ সূত্রে তারা ছিলেন বেশ প্রভাবশালী। গ্রামের সালিশ-বিচারে তাদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। বিভিন্ন উপলক্ষে তারা অনুদান-চাঁদা দিত। তাহলে তাদের থায়িদ্দার বলা হতো কেন? থায়িদ্দার শব্দটির  প্রকৃত শব্দ কী, আজও আমি জানি না। অভিধানে খুঁজলাম, পেলাম না। তবে তাদেরকেই থায়িদ্দার বলা হতো, যারা চোর-ডাকাতের চুরি-ডাকাতি করা মালপত্রের নিরাপদ আশ্রয় দিত এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করত। এতে কার লাভ, কার ক্ষতি? চোর-ডাকাতরা সাধারণভাবে ছিল অভাবী লোক। তাদের ঘরে চুরি-ডাকাতির মূল্যবান মালপত্র রাখলে লোকে সন্দেহ করবে। প্রয়োজনে গ্রামে সালিশ বসবে তাদের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের জন্য। তাই তারা চুরি-ডাকাতির মালপত্র রাখত থায়িদ্দারের বাড়িতে, তাদের হেফাজতে। এ মালপত্র বিক্রিলব্ধ টাকা থেকে তারা একটা অংশ পেত। এসব কারণে গ্রামে খারাপ লোককে সাধারণভাবে বলা হতো ‘চুরের থায়িদ্দার’। অবশ্য এদের সত্যই ভয় করত। লোকমনে ধারণা ছিল, এরা যদি চোর-ডাকাতের কাজে সাহায্য না করত, চুরি-ডাকাতির মালপত্র নিরাপদে গচ্ছিত না রাখত, তাহলে গ্রামাঞ্চলে এত চুরি-ডাকাতি হতো না। লোকে শান্তিতে ঘুমাতে পারত। তখনকার দিনে, আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে চোর-ডাকাতের বড় উপদ্রব ছিল। এর বিচারে গ্রামে ‘সালিশ’ও বসত। কিন্তু ‘হা হতোস্মি’ কিছুতেই কিছু হওয়ার নয়। চোর-ডাকাতের বড় বেশি ভাগ্য পরিবর্তন হতো না। হতো থায়িদ্দারের, অর্থ-বিত্তে তারা বলীয়ান হতো, সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে এদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ত। অথচ এই থায়িদ্দার যদি সেফ কাস্টডি না দিত, তাহলে এত চুরি-ডাকাতি হতে পারত না। শত হোক, চোর-ডাকাতরা চুরি করা, ডাকাতি করা মালপত্র রাখত কোথায়?

‘কালো টাকা’ বা অপ্রদর্শিত টাকার অবস্থাও হয়েছে তা। একসময় কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকার থায়িদ্দার হিসেবে কাজ করত দেশের ব্যাংকগুলো। আবার জমিজমা, ফ্ল্যাট-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পেও কালো টাকা, অপ্রদর্শিত টাকা রাখা যেত। বলা বাহুল্য, ব্যাংকে ‘ভালো’ টাকা রাখার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু ইদানীং ব্যাংকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকা রাখা এক সুকঠিন ব্যাপার। জমিজমা, ফ্ল্যাট ইত্যাদিতে এসব টাকা লুকানোর কাজটিও কঠিন। দেশে ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন’ আইন আছে। এর বিভিন্ন ধারাবলে এবং ‘অ্যান্টি-টেরোরিজম আইনের’ নানা ধারাবলে এখন ব্যাংকে টাকা রাখতে গেলে টাকার উৎস কী, তা ঘোষণা দিতে হয়। হিসাব খোলার সময় ‘কেওয়াইসি’ (নো ইউর কাস্টমার) অনুযায়ী যাবতীয় তথ্য ব্যাংকে জমা দিতে হয়। ‘কাস্টমার’ ভেদে কার টাকায় কত ‘ঝুঁকি’ আছে তা ম্যানেজারদের নিরূপণ করতে হয়। গ্রাহককে বলতে হয় সাপ্তাহিক লেনদেন  (ট্রানজেকশন প্রোফাইল) কত হবে। টাকার অংকে এবং লেনদেনের সংখ্যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে টাকার উৎস কী বলতে হবে। বিধি হচ্ছে ১০ লাখ টাকা তোলা ও জমার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে খবর পাঠাতে হয়। একে ‘ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্টিং’ বা সিটিআর বলা হয়। ব্যাংকের সন্দেহ হলে, ব্যাংকের যদি মনে হয় এটা অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা, তাহলে ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন (সাসপিশাস ট্রানজেকশন) হিসেবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে রিপোর্ট করতে হয়। ব্যক্তির হিসাব, প্রভাবশালী ব্যক্তির হিসাব, ব্যবসায়ীর হিসাব, শিল্পপতির হিসাবের প্রত্যেকটি আলাদা ভিত্তিতে মনিটর করে ব্যাংক। তা করার জন্য প্রত্যেক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে, প্রতিটি শাখায় নির্দিষ্ট কর্মকর্তা রয়েছেন। মাসিক, সাপ্তাহিক, বার্ষিক রিপোর্ট করতে হয়। হিসাব খোলার সময় হিসাবধারীকে এত কিছু বলতে হয়। তিনি আমেরিকার নাগরিক কিনা, গ্রিনকার্ড হোল্ডার কিনা, সেখানে ট্রানজেকশন করেন কিনা ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ বর্ণনা করলে, বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা আজকাল  দেশে কোনো ব্যাংকে রাখা খুবই কঠিন। ব্যাংক বাদেও রয়েছে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান, যারা বিষয়টি তদারক করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, অবৈধ টাকা রাখার থায়িদ্দার দেশে আর নেই। তাহলে অবৈধ টাকার মালিকদের উপায় কী?

দেশীয়ভাবে থায়িদ্দার না থাকলেও ইদানীং দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে থায়িদ্দারের কোনো অভাব নেই। উন্নত ও সভ্য দেশগুলোই এখন অবৈধভাবে অর্জিত টাকার থায়িদ্দার। সেসব দেশই এখন উন্নয়নশীল দেশের চোরদের-ডাকাতদের টাকার গন্তব্যস্থল। মজার ঘটনা দেশের ব্যাংকগুলো থায়িদ্দারের কাজ না করতে পারলেও বিশ্বের তাবৎ বড় ব্যাংকের সহায়তায় দেশ থেকে অবৈধ টাকা পাচারে সহায়তা করে যাচ্ছে। আগে মনে করত ‘হুন্ডিওয়ালারাই’ অর্থ পাচারের কাজ করে। এখন এটা পরিষ্কার যে ব্যাংকই নতুন হুন্ডিওয়ালা। তারা আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ (পণ্যের দাম বেশি দেখানো) অথবা ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ (পণ্যের দাম কম  দেখানো)-এর মাধ্যমে অবৈধভাবে টাকা পাচারে সহায়তা করে। এতে জড়িত হয় ছোট-বড় অনেক ব্যবসায়ী। সবচেয়ে বড় কথা, টাকা শেষ পর্যন্ত যায় কোথায়? অবৈধ টাকার শেষ গন্তব্যস্থল কোথায়? অবৈধ টাকার শেষ গন্তব্যস্থল কোথায়, কে এ টাকার থায়িদ্দার? প্রতিদিন খবর ছাপা হচ্ছে, এসব টাকার গন্তব্য ও নিরাপদ হেফাজতের জায়গা হলো আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, দুবাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশ। দুনিয়ার যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের কালো টাকা বা অবৈধ টাকা এসব দেশে সমাদৃত। তারা বিজ্ঞাপন দিয়ে, নানা কর্মসূচির মাধ্যমে লোকজনদের অবৈধ টাকা নিয়ে যেতে আহ্বান করে। বিনিয়োগের নামে নাগরিকত্ব দেয়, স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়। তারা টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করে না। তারা ডলার চায়। শুধুই ডলার। উন্নয়নশীল দেশ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা, তা তাদের বিবেচ্য নয়। এসব দেশে অবৈধ টাকা দিয়ে কীভাবে সহায়-সম্পদ করা যায়, কীভাবে ব্যবসা করা যায়, কীভাবে বাড়িঘর করা যায় তার জন্য উকিল, উপদেষ্টা ইত্যাদি শ্রেণীর লোক আছে। এদের অনেকেই বাংলাদেশে নিয়মিত আসেন। বড় বড় হোটেলে ওঠেন। সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন এবং তা প্রকাশ্যেই। আবার এসব দেশের কারো কারো রয়েছে ছোট ছোট স্যাটেলাইট দ্বীপ রাষ্ট্র। এসব দ্বীপ রাষ্ট্র মজার রাষ্ট্র। কোনো ট্যাক্স নেই। যত খুশি তত টাকা নিয়ে সেখানে যাওয়া যায়। কেউ কোনো প্রশ্ন করে না। ডলার সাদরে গৃহীত। নাগরিকত্ব অতিসহজ। সেখানে উকিল, ব্যারিস্টার, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, বিনিয়োগ কোম্পানি, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সেইফ কাস্টডিয়ান থেকে শুরু করে ডজন ডজন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সারা দুনিয়ার চোর-ডাকাত-পাচারকারীদের বন্ধু বলে গ্রহণ করে। এসব দ্বীপরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ওই চোরাই টাকা বড় বড় ব্যাংকে নিয়ে যায়, বিনিয়োগ কোম্পানিতে নিয়ে যায়। এরা আন্তর্জাতিকভাবে ওইসব টাকা বিনিয়োগ করে এবং এর থেকে লভ্যাংশ জমা দেয় অবৈধ টাকার মালিকদের অ্যাকাউন্টে। দেখা যাচ্ছে আমরাসহ উন্নয়নশীল দেশ যাদের ঘৃণাভরে বিদায় করছে, তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার জন্য উন্নত ও সভ্য দেশগুলো কাজ করছে থায়িদ্দার হিসেবে।

এখানে দুটো প্রশ্ন। সারা দুনিয়ার দেশে দেশে উন্নত ও সভ্য দেশগুলো ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন’ নামে একটি আইন করিয়েছে। এর অধীনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা পাচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত টাকা পাচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব ‘মনিটর’ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স’ (এফএটিএফ)। অত্যন্ত কড়া ও প্রভাবশালী টাস্কফোর্স। ‘মানি লন্ডারিংয়ে’ বা অর্থ পাচারে জড়িত দেশকে তারা প্রতিনিয়ত শাস্তি দিচ্ছে। তারা কোনো দেশকে মানি লন্ডারিংয়ে জড়িত বলে সাব্যস্ত করলে ওই দেশের ‘ক্রেডিট রেটিং’ হবে নিম্নগামী। এটা হলেই বিপদ। কোনো ব্যাংক আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) গ্রহণ করবে না, ঋণ দিলে সুদহার হবে বেশি। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে কোন জাদুবলে উন্নত ও সভ্য দেশগুলো হরেদরে অবৈধ টাকাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে? অবৈধ টাকার মালিক ও পাচারকারীরা কোথায় বসতি স্থাপন করছে, তা খবরের কাগজে প্রতিদিন ছাপা হচ্ছে। ‘ইউটিউবে’ দেখানো হচ্ছে সেসব অভিজাত বাড়িঘর। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নামদামসহ খবর ছাপছে। কই উন্নত ও সভ্য দেশগুলো তো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং তারা তাদের আইনি আশ্রয় দিচ্ছে। ভারতের এক বড় শিল্পপতি ব্যাংকের টাকা মেরে ইংল্যান্ডে গেছেন। ভারত সরকার তাকে দেশে ফেরানোর জন্য আইনের মাধ্যমে চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্রিটেনের আদালত তাকে আশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি ও তার পরিবার তাদের নাগরিক। তারা প্রশ্ন করছে না, এ ‘মালব্য’ পদবিধারী শিল্পপতি কীভাবে টাকা-পয়সা পাচার করে ব্রিটেনের নাগরিক হলেন। এ বড় অদ্ভুত এক অবস্থা। পাচারকারীরা সহজেই ওইসব দেশের নাগরিক হচ্ছেন, তাদের আইনি আশ্রয় নিচ্ছেন। যেসব দেশ থেকে এরা যাচ্ছেন, সেসব দেশ থেকে সরকারের বিনা অনুমোদনে টাকা বিদেশে নেয়া যায় না। তাহলে কীভাবে তারা টাকা নিয়ে সেখানে গেলেন, এ প্রশ্ন তারা করছে না কেন? এর কারণ ও উদ্দেশ্য কী?

সব উন্নত ও সভ্য দেশের দূতাবাস ঢাকায় আছে। তারা বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের খবর প্রতিদিন কাগজে পড়ছে। আমাদের পুলিশ যদি খবর পেত যে বাংলাদেশে অবৈধভাবে কেউ টাকা নিয়ে এসেছে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার পেছনে লাগত। আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিত। কিন্তু দূতাবাসগুলো আমাদের দেশের অবৈধ টাকাওয়ালাদের খবর পেয়েও কোনো কথা বলছে না। আমাদের বেলায় ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স’ (এফএটিএফ), তাদের বেলায় এসব কিছু নেই। এদিকে দেখা যাচ্ছে দেশে বিপুলসংখ্যক বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, সমাজকর্মী ইত্যাদি শ্রেণীর লোক আছেন, যারা ন্যায্যতই অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকার বিরুদ্ধে সোচ্চার। তারা কালো টাকার বিরুদ্ধে সোচ্চার কিন্তু থায়িদ্দারের সম্পর্কে কিছু বলছেন না। যেসব দেশ কালো টাকার গন্তব্য স্থান, যেসব দেশ কালো টাকার মালিকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের সম্পর্কে সুশীল সমাজের লোকজন নীরব। অথচ তারা এর প্রতিবাদ করতে পারতেন, খবরের কাগজে উন্নত ও সভ্য দেশের দ্বিচারিতা সম্পর্কে লিখতে পারতেন। সরকারের ওপর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন। না, তারা তা করেছেন বলে এমন কোনো প্রমাণ দেখছি না। এর অর্থ কী? এর ফলাফল কী দাঁড়ায়? এ অবস্থায় কেউ যদি বলে, ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ থেকে টাকা ভাগিয়ে উন্নত দেশে নেয়ার একটা কৌশল, তাহলে কীভাবে এর প্রতিবাদ করা হবে? সুশীল সমাজ থায়িদ্দারদের সম্পর্কে কিছু না বলে প্রকারান্তরে কি উন্নত দেশগুলোর দ্বিচারিতাকে সমর্থন করে যাচ্ছে না? 

 

আরএম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক