আমার শাশুড়ির সঙ্গে এক ইথাকা রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম, যিনি ভারত থেকে বেড়াতে এসেছেন। তখন চীনা খাদ্য পরিবেশিকা তাকে জিজ্ঞেস করেছেন, তিনি কোত্থেকে এসেছেন। আমার শাশুড়ি প্রত্যুত্তরে বলেছেন, ‘কোলহাপুর’ থেকে—মহারাষ্ট্রের ছোট্ট একটি শহর, যেখানে তার জন্ম। আমি বেশ বিস্মিত হলাম যে খাদ্য পরিবেশিকাকে খুব আনন্দিত দেখাচ্ছে। খাদ্য পরিবেশিকা বলল, আমিও কয়েক বছর সেখানে ছিলাম।

কথোপকথনের আদান-প্রদানে তারা সহজেই পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাল। আমার শাশুড়ি বললেন, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো আইসক্রিম সেখানকার এবং ওয়েট্রেস একমত হলো যে কোলহাপুর ছাড়ার পর এর চেয়ে ভালো আইসক্রিম সে আর খায়নি। কিছুক্ষণ পর আমি উপলব্ধি করলাম কী ঘটছে: আমার শাশুড়ি কোলহাপুর সম্পর্কে বলছিলেন, আর ওয়েট্রেস বলছিল কুয়ালালামপুর সম্পর্কে। কিন্তু সব তথ্যই পরিপূর্ণভাবে মিলছিল, তাই তাদের আনন্দ মাটি করতে কোনো ধরনের বাগড়া না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ভাষা বড়ই অদ্ভুত বিষয়। এটি মানুষের প্রগতি ও সুখের সম্ভবকারী বা মধ্যস্থতাকারী (ইথাকায় ঘটা কারো মজাদার ভুল বোঝাবুঝিসহ)। তবে এটি সংঘাত ও নির্যাতনের উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে।

গেম থিওরিসহ সামাজিক বিজ্ঞানগুলো থেকে ভাষা ও সংঘাতের মধ্যকার সংযোগ অনেকেই যেমনটা ভাবে ততটা বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। আরো নিবীড়ভাবে, গভীরভাবে এ সংযোগ আবিষ্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিবিদ এবং অন্য গবেষকরা সমকালীন বিশ্ব সম্পর্কে বুঝতে আমাদের বড় ধরনের সাহায্য করতে পারেন।

সর্বোপরি আমরা সবচেয়ে ভালো ও খারাপ সময়ে বাস করি। আজকের মতো বিশ্ব আর কখনো এতটা সমৃদ্ধ হয়নি। যদিও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ, বৃহৎ শক্তির শত্রুতা এবং অভিবাসনবিরোধী বিদ্বেষ বা ভীতির মধ্যে এ সমৃদ্ধি স্তরে স্তরে বিভক্ত হয়ে আসছে।

আজকের বর্ধিষ্ণু সমৃদ্ধি ও গভীরতর হওয়া বিভাজনের মেলবন্ধন শিল্প বিপ্লবের স্মারক, যা অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে শুরু হয়েছিল এবং প্রায় একশ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আশ্চর্যের নয়, ওই যুগে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম স্মিথের ওয়েলথ অব নেশনস, অগাস্টিন কোরনট ও লিয়ন ওয়ালরাসের অবদানসহ প্রধান প্রধান তাত্ত্বিক পরিবর্ধন সাধিত হয়েছিল। তাদের অবদান বা তাত্ত্বিক কাজগুলো প্রতিদিনকার গবেষণা পর্যবেক্ষণ বা অনুসন্ধান ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিশ শতকে জন হিকস, পল স্যামুয়েলসন ও কেনেথ অ্যারোর বিশাল গবেষণা কর্মের মতো তারা কীভাবে অর্থনীতি কাজ করে এবং বাজার ও অর্থনৈতিক কল্যাণে রাজনীতি কীভাবে মিথস্ক্রিয়া করে, সে সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করেছিলেন।  

যদিও আমরা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অর্থনীতির পথ অনুমান করতে পারি না। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে এটি বহুমাত্রিক নির্দেশনায় হবে। ভাষা সম্ভবত সেগুলোর অন্যতম। কিছু বিশেষজ্ঞ এরই মধ্যে ভাষার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি সংযোজন করেছেন, যেমন নিজের গবেষণা প্রবন্ধ ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’-এ প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির স্টিফেন মরিস করেছেন। তবে আরো অনেক কিছু করতে হবে। বিশেষ করে ভাষা ও সংঘাতের মধ্যকার সংযোগ বিষয়ে।&dquote;&dquote;

এ সংযোগের লক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে স্পষ্ট, যেখানে গত মাসের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি মন্তব্য করেছেন; যা সুস্পষ্টভাবে বর্ণবাদী। চারজন অশ্বেতাঙ্গ ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস নারীকে বলেছেন, তারা যে দেশ থেকে এসেছেন, তাদের সেখানে ‘ফিরে যাওয়া’ উচিত। এমনকি যদিও তাদের মধ্যে তিনজনের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে এবং চতুর্থ জন একজন স্বাভাবিক নাগরিক, যিনি এসেছিলেন শিশু শরণার্থী হিসেবে। এটি সত্য, সাদা পরিচয়ের মানুষদের প্রতি আবেদনে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে হয় কিছু সমর্থক পেয়েছেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না যে তার সব সমর্থকই বর্ণবাদী। উদার ব্যাখ্যা হলো, তারা ট্রাম্পের সমালোচকদের থেকে ভিন্নভাবে ভাষা ব্যবহার করেন।

কারণ বক্তা কী অর্থে বলে এবং শ্রোতা কী শোনে, সেটি খুবই ভিন্ন হতে পারে। ভাষা গোলযোগ উত্তেজিত করে দেয়ার একটি হাতিয়ার হতে পারে। বেশির ভাগ সমস্যা এ বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত যে, বাস্তব জগৎ সাংঘাতিকভাবে ভিন্নতর এবং খণ্ডিত, যেখানে তুলনার দিক থেকে ভাষা অমার্জিত বা অশিষ্ট। কিছু রাজনৈতিক নেতা জনগণকে নিয়ন্ত্রণ ও দমন করায় এটি কাজে লাগাতে চান। 

জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ১৯৮৪-এ নিউজপিক ডিকশনারির ১১তম সংস্করণে ‘ভাষাকে বাস্তবের অস্থিমজ্জায় নামিয়ে আনতে’ একদল আমলার কাজ করার বর্ণনা করেন। অরওয়েল যা বর্ণনা করেন ‘ক্ষুধার্তভাবে রুটিতে দাঁত বসানো’ হিসেবে এবং বলেন, ‘এটি সুন্দর বিষয়, শব্দের বিনাশ।’

উদাহরণস্বরূপ, রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার বর্ণনার চেয়ে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘কমিউনিজম’ দুটি শব্দকে যদি মানুষ সমার্থক মনে করে, তাহলে শেষোক্ত শব্দটির ভয় উদ্রেক ছাড়া প্রথমোক্ত শব্দটি সম্পর্কে কথা বলা অসম্ভব হতে পারে। একইভাবে ইসরায়েলে একটি দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী কোনো গোষ্ঠীর যেকোনো সমালোচনা অ্যান্টি-সেমিটিজমের (কিংবা ইহুদি সমালোচকদের ক্ষেত্রে আত্মঘৃণা) সমতুল্য, এ মতামত প্রচারের মাধ্যমে ভিন্ন মত প্রতিহত করতে পারে। এটি গোষ্ঠীটিকে সমালোচনা এড়াতে অনেক মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে, যারা অ্যান্টি-সেমিটিক হতে ঘৃণা করবে।

ভারতে কেউ যদি বামপন্থী ধারণার প্রতি অনুরাগ দেখায়, তাহলে কিছু গোষ্ঠী তাকে ‘আরবান নকশাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। একইভাবে কলাম লেখক মৃণাল পান্ডে জোর দিয়ে বলেছেন, একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি এবং কর্তৃত্ববাদী ধারণা উন্নয়নে আধুনিক হিন্দির ব্যবহার কীভাবে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং খোদ ভাষার সুনামই ক্ষুণ্ন করে।

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পটভূমি থেকে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর মানুষকে একত্রে আনার মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের অব্যাহত বৃদ্ধি সংঘাত ও রাজনৈতিক দুষ্কর্ম বাড়াচ্ছে। তাদের অনেকের কাছে একই শব্দের ভিন্ন আবেগিক বা রাজনৈতিক যথার্থতা থাকতে পারে এবং শব্দের একই অনুক্রম ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে, এমনকি স্ববিরোধীভাবেও।

শব্দের নানা অর্থ দ্যোতনা তৈরি হওয়ায় অনেক মানুষ নিজেদের সমালোচনার আসনে না দেখার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু শব্দ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। সমালোচনার আসনের নানা রূপান্তর ঘটায় একটি গতিশীল প্রক্রিয়া অব্যাহতভাবে মেরুকৃত সমাজ তৈরি করছে। এসব গতিশীলতা বোঝার জন্য প্রয়োজন যুক্তির সমন্বয়, ভারসাম্য অবস্থা বিশ্লেষণ, দর্শন ও সৃজনশীলতা।

অষ্টাদশ শতকের শেষ ও উনিশ শতকের শুরুর দিকে যেমনটা পরিবর্তন হয়েছিল, তেমনি বিশ্ব খুবই দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। কাজেই অর্থনীতিবিদদের মহৎ নির্দেশনা খুঁজে বের করার এখনই সময়, যেমনটা তাদের প্রোজ্জ্বল পূর্বসূরিরা করেছিলেন।

[স্বত্ব: প্রোজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ; ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির