ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান ধীরে ধীরে রূপান্তর হয়েছে বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা ছাড়া এটিকে অন্য কিছু ভাবার উপায় নেই এখন। অথচ একসময় স্থানটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল রাজধানীতে একটি শান্ত, স্নিগ্ধ, অভিজাত ও আদর্শ আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে। সেসব আজ অতীতের কথা। কাঠাপ্রতি ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে এ এলাকার আবাসিক প্লটগুলো বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের সুযোগে জমির দাম আকাশ ছুঁয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান পরিবর্তন করে ক্ষণে ক্ষণে নির্দেশনা জারি করে আবাসিক এলাকাকে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরের প্রবণতা বন্ধ হওয়া চাই। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্নীতি হচ্ছে কিনা এবং এর সঙ্গে কারো স্বার্থ জড়িত আছে কিনা, তা যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজধানীকে বাস উপযোগী করতে হলে সবকিছু পরিকল্পনামাফিক করতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় নির্দিষ্ট ছাড়া যেন কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা হতে না পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
একসময় রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালতের মূল কেন্দ্র ছিল মতিঝিল-দিলকুশা এলাকা। নামিদামি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিংহভাগেরই প্রধান কার্যালয় ছিল সেখানে। কিন্তু সেই দৃশ্যপটে বদল ঘটেছে কয়েক বছর ধরে। এর স্থান দখল করে নিয়েছে গুলশান-ধানমন্ডির মতো কয়েকটি আবাসিক এলাকা। দফায় দফায় ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্যিক এলাকার পরিধি বাড়ানো হয়েছে, কমানো হয়েছে আবাসিক এলাকা। ঘোষণার বাইরে থাকা এলাকাও বর্তমানে বাণিজ্যিকীকরণের কবলে। কয়েক বছর আগে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডি এলাকার সব অবৈধ স্থাপনা ১০ মাসের মধ্যে সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকার মধ্যে স্থাপিত সব বাণিজ্যিক স্থাপনাও এ সময়ের মধ্যে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। হতাশার বিষয় হলো, উচ্চ আদালতের নির্দেশও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রথম দিকে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। অর্থের বিনিময়ে সেগুলোর ভূমি শ্রেণী পরিবর্তন করে স্থাপনার বৈধতা দেয়া হয়েছে। অর্থ আয়ের প্রবণতা থেকে এমন পদক্ষেপ কাম্য নয়। এ কথা সত্য, আবাসিক এলাকার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কিছু বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন এবং সেটি সম্প্রসারণও হতে পারে। কিন্তু গুলশান-ধানমন্ডির মতো আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করার আগ্রাসী প্রবণতা কোনো যুক্তিতেই ঠিকে না। অর্থের বিনিময়ে অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ না করা এবং এর বৈধতা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
উন্নত দেশ তো বটেই, অনেক উন্নয়নশীল দেশও আদর্শ আবাসিক এলাকা নিশ্চিত করেছে। তারা মনে করে, দেশের নাগরিক হিসেবেই তারা আবাসিক এলাকার সেবা পেতে বাধ্য। আমাদের এখানে আবাসিক এলাকায় যেসব সমস্যা আছে সেগুলো ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও ছিল। এসব দেশ সফলতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে সমর্থ হয়েছে। সেখানে আবাসিক ও অনাবাসিক এলাকা ভাগ করা। দেখলেই আবাসিক এলাকা চেনা যায়। অনাবাসিক এলাকায় কখনই আবাসিক স্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয় না। অনাবাসিকের চরিত্রও আলাদা।
গুলশানে বসবাসরতদের সবচেয়ে বড় সংগঠন হলো গুলশান সোসাইটি। তারা এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিরসন ও উন্নয়নের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়। তারা রাজউক ও সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা অবগত করে। এর আগে সোসাইটির পক্ষ থেকে গুলশান এলাকাকে ছয়টি জোনে ভাগ করে সেখানে অবৈধ ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, পার্কিং ছাড়া নির্মিত বাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার একটি তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হয়। তাতে কোনো কাজ হয়নি। আবাসিক এলাকা থেকে স্কুল কিংবা হাসপাতাল রাতারাতি সরিয়ে ফেলা যাবে না। এর একটা চাহিদা আছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের সমস্যাও হচ্ছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকতে হবে এবং সেটা মেনে চলতে হবে। আবাসিক এলাকার পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয় সিটি করপোরেশন ও রাজউকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। এসব অনিয়ম দূর করতে হবে। মাঝেমধ্যেই রাজধানীর আবাসিক এলাকার সব অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক ও সিটি করপোরেশন। কিন্তু কোনো অভিযানই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তারাই আবার অর্থের বিনিময়ে এগুলোর বৈধতা দিচ্ছে, পরিকল্পনাও পরিবর্তন করছে। এমন প্রবণতা সাংঘর্ষিক ও স্ব-বিরোধী। এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বা আইন মেনে চলতে চায় না সেটিকে আরো বেশি উৎসাহিত করবে। এক্ষেত্রে অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্মার্ট গ্রোথ কনসেপ্টকেই বেশির ভাগ দেশ কাজে লাগিয়েছে। এ কনসেপ্টের সঠিক প্রয়োগে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকাও আদর্শ আবাসিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এ ধারণায় আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরে শুধু শিশুদের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা থাকতে পারে। প্রার্থনা গৃহ, যেমন মসজিদ ও মন্দির নির্মাণ হতে পারে। প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক স্থাপনা, যেমন মার্কেট, রেস্টুরেন্ট প্রভৃতি হতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ঢালাওভাবে সব প্রতিষ্ঠানের অফিস হতে পারে না। সবচেয়ে বড় ব্যবস্থাটি হলো আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কাজের অনুমোদন নিষিদ্ধ করা।
নগরবিদদের মতে, রাজধানীর আবাসিক এলাকাকে বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত করার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে ধানমন্ডি থেকে। দুই দশক আগে ধানমন্ডিতে চারতলার উপরে কোনো ভবন ছিল না। এখন ইচ্ছামতো উচ্চতায় দালানকোঠা তৈরি হচ্ছে। ভাড়া দেয়া হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে। এখন গুলশান-বনানী-বারিধারায়ও এ প্রবণতা সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। গুলশান-বনানী এলাকায় বাণিজ্যিক প্রয়োজনের জন্য আলাদাভাবে নকশা করা থাকলেও রাজউক সেটি মানছে না। ধীরে ধীরে ঘিঞ্জিতে পরিণত হতে চলেছে পরিকল্পিত নকশায় গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকা গুলশান-বনানী। একে একে আবাসিক এলাকাগুলো তার চরিত্র হারিয়ে ফেলছে। শুধু আইন প্রণয়ন করেই আদর্শ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যেসব দেশ এ সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে, তারা এজন্য সবার আগে গুরুত্ব দিয়েছে জনসচেতনতাকে। আমাদের এখানে জনসচেতনতা ও সম্পৃক্ততা না থাকাই আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলেই আবাসিক এলাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে না। মালয়েশিয়া পেরেছে, কারণ তারা বদ্ধপরিকর ছিল যে এমন না করলে তাদের মুক্তি নেই। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের আইনও খুবই কঠিন। আমরাও তাদের অনুসরণ করতে পারি।
বিদ্যমান অবস্থায় কিছুদিন আগে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও বারিধারা আবাসিক এলাকার সব অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদের যে উদ্যোগ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে কাজটা খুব সহজ হবে না। এজন্য দৃঢ়সংকল্পের পাশাপাশি কার্যকর তত্পরতা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। প্রথমেই প্রয়োজন উচ্ছেদ অভিযান সুসম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কী প্রক্রিয়ায় সে পরিকল্পনা কতটা সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা। আবাসিক এলাকাগুলোয় বাণিজ্যিক ও অন্যান্য অবৈধ স্থাপনা যেমন রাতারাতি গড়ে ওঠেনি, তেমনি এগুলো রাতারাতি উচ্ছেদ করাও সম্ভব হবে না। বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে—কোনো অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে তার মালিক আদালতে মামলা করলে এবং আদালত স্থগিতাদেশ দিলে যে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হতে পারে, তা কীভাবে কাটানো হবে। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে যারা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়েছেন, তারা উচ্ছেদ এড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। এ রকম মামলার সংখ্যা অনেক হবে, যা সহজেই বোধগম্য। তবু সব জটিলতা দূর করে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি প্রশাসন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও রাজউককে সঙ্গে নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সুসমন্বিতভাবে এ জনমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নে তত্পর হোক। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অর্থ আয়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রভাবশালীদের চাপে কোনো আবাসিক এলাকা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তর বন্ধ করতে হবে।










