বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়, যা একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কয়েক বছর আগেও ‘লোডশেডিং’ শব্দটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত ছিল। কারণ, উৎপাদিত বিদ্যুতের সঠিক সরবরাহ করা হতো না। যা হোক, বর্তমান সরকারের সাফল্যের কারণে এ লোডশেডিং শব্দটি এখন বিলুপ্তির পথে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমাদের দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রভাব পড়েছে।
এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মৌলিক জ্বালানি সরবরাহ হ্রাসের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য লোডশেডিং সমস্যাটি আবার একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পীড়াদায়ক গ্রীষ্মের তাপ ও তীব্র তাপদাহ আরো বেড়ে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসন বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও তা কতদিন চলবে, তা কেউ-ই ধারণা করতে পারছে না। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বিদ্যুৎ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বরং এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদ। তাই এ অবস্থার সমাধানে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এ সম্মিলিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে না।
তাই এ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা মাথায় রেখে আমাদের সবার সচেতন হওয়া উচিত। এ অবস্থায় বিদ্যুতের অপচয় বন্ধের বিকল্প নেই। যদি বিদ্যুতের ব্যবহারের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করা হয়, তাহলে বিদ্যুতের মোট চাহিদা তুলনামূলক হ্রাস পেতে পারে। এ অবস্থায় প্রথম পদক্ষেপটি হলো কোনো এলাকায় বিদ্যুতের অপব্যবহার হচ্ছে কিনা বা ব্যবহার সীমিত এবং বিদ্যুতের বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে কিনা। প্রযুক্তির ওপর আমাদের অত্যধিক নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
এছাড়া নিম্নলিখিত কাজগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুতের অপচয় হওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। এ রকম একটি উদাহরণ হলো—
১. মাইক্রোওয়েভ, রাইস কুকার এবং কারি কুকার যথাসম্ভব কম ব্যবহার এবং একেবারে প্রয়োজন না হলে ফ্যান, লাইট, পিসি, ওভেন ইত্যাদি চালু না করা। ২. প্রয়োজন না হলে দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় চার্জার লাগানো এড়িয়ে চলা। ৩. নষ্ট বৈদ্যুতিক সংযোগ মেরামত করা। ৪. বৈদ্যুতিক পাখা এবং আলো ব্যবহারে ইলেকট্রনিকস নিয়ন্ত্রক ব্যবহার করা। ৫. শক্তিসাশ্রয়ী বাল্ব ব্যবহার করা। ৬. যেহেতু এসির তুলনায় ফ্যানে বিদ্যুৎ কম লাগে, তাই অদূর ভবিষ্যতে ফ্যান ব্যবহার করার কথা মাথায় রাখা। ৭. ঘরের দরজা-জানালা খোলা রেখে দিনের আলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার এবং দিনের বেলা আলোর ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
তাছাড়া যখন-তখন পোশাক শুকানোর জন্য ওয়াশিং মেশিন, হেয়ার ড্রায়ার বা ফ্যান ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে সূর্যালোক এবং সৌরশক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি জরুরি। পানি গরম করার জন্য হিটার বা গিজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস, দিনের আলোর সঙ্গে মানিয়ে নেয়া, উৎসবের আলো হ্রাস এবং শপিং সেন্টার, মার্কেট, রেস্তোরাঁ ইত্যাদিতে বিদ্যুতের অপব্যয় রোধ করা।
‘দিনের আলোতে মোমবাতি জ্বালাবেন না’। ‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি!’। (কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের লেখা একটি বাংলা কবিতার একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি)।
এ অনুচ্ছেদটি পড়ে যা শিখেছেন তা অনুশীলন করার সঠিক সময় এখন। তা না হলে বর্তমান বিদ্যুতের সংকট আমরা আর বেশি দিন সহ্য করতে পারব না। এছাড়া আরো বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দুঃখের বিষয়, কীভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয় সে বিষয়ে সরকারের অসংখ্য সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও আমরা নিষ্ক্রিয় হয়েই আছি। এ উদাসীনতার প্রাথমিক কারণগুলো হলো আমাদের মানসিকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। যা হোক, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ মুহূর্তে অনেক সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় আমার বিচক্ষণতা কী হওয়া উচিত!
আমাদের এ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। যদি সম্ভব হয়, পরিচিত, প্রতিবেশী এবং পরিবারের সদস্যদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিদ্যুৎ অপচয়ের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করা উচিত। প্রয়োজনে বিজ্ঞাপন, লিফলেট বিতরণ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় উদ্যোগের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। যেহেতু একটি জাতি তার সব নাগরিক নিয়ে গঠিত, তাই আমাদের প্রতিটি অনন্য উদ্যোগ দেশের সংকট নিরসনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এ কারণে এটা অত্যাবশ্যক, আমরা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে শক্তি ব্যবহার করি, সে সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যাবশ্যক।
উপরন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে বিকল্প শক্তির উৎস অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই। সৌরশক্তি বর্তমান এবং জলবিদ্যুৎ, বায়ু খামার, গার্হস্থ্য বায়ু শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি এবং সমুদ্রের তাপ শক্তি—এ উৎসগুলোর কয়েকটি উদাহরণ। এসব বিকল্প উৎসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ অপচয় রোধের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—উভয় প্রজন্মের বিদ্যুৎ সংকট দূর করা সম্ভব।
সামিনা আক্তার, উন্নয়নকর্মী










