কিছুদিন আগে দেশে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপিত তথ্য বলছে, এবারের বন্যায় দেশের ১৮টি জেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক প্লাবনে বাড়িঘর, ফসল থেকে শুরু করে যোগাযোগ অবকাঠামো সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহামারীর প্রকোপ থেকে সবে মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কভিডের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বন্যায় আবার একটা বড় জনগোষ্ঠী ভুগেছে। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বন্যায় সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় ত্রাণসহায়তা দেয়া হয়েছে। মৌলিক জিনিসপত্র জোগানো হয়েছে। কিন্তু উপদ্রুত এলাকার মানুষ এখনো ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। জনজীবন এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সুতরাং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের সহায়তা প্রদান এবং অবকাঠামো সংস্কারে সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এবারের বন্যার ভয়াবহতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। অনেকেই প্রিয়জনকে হারিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৬৮ জন মারা গিয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের বাড়িঘর তলিয়ে গিয়েছে। খাদ্যসহ নষ্ট হয়েছে মূল্যবান আসবাব। কোথাও জমির সম্পূর্ণ ফসল, কোথাও আবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গিয়েছে অনেক গবাদিপশু। অনেকের পোলট্রি খামার এবং  পুকুর-জলাশয়ের মাছ তলিয়ে গিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক জায়গায় ব্রিজ-কালভার্ট এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ তো গেল দৃশ্যমান ক্ষতি। আবার কিছু ক্ষতি হয়েছে, যা অপরিমাপযোগ্য। মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে উপদ্রুত এলাকার মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোই এখন চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্বের অনেক দেশে বন্যার প্রকোপ বাড়ছে। গত বছর জার্মানিতে ভয়াবহ বন্যা হয়। মারা যায় ১২০ জন। একই সময়ে বেলজিয়ামেও বন্যার কবলে পড়ে বিপুল মানুষ। থাইল্যান্ডও প্রবল বন্যার মুখে। এমনকি সে বন্যায় রাজধানী ব্যাংককেও পানি উঠেছিল। এ ধরনের বন্যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশগুলো নতুন করে সতর্ক হয়ে উঠছে। নদ-নদীগুলোয় অবাধ পানি প্রবাহ নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সুসমন্বিত ও উন্নত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। ১৯৫৩ সালের এক ভয়াবহ বন্যায় দেশটি অবর্ণনীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়। এ ধরনের ক্ষতি যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, এজন্য ওই বছর একটি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং তার আওতায় ডেল্টা ওয়ার্কস নামে কর্মসূচি চালু করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় হাতে নেয়া হয় রটারড্যাম হারবার প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় নদীশাসন প্রকল্প। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার ও তাদের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করে বড় সব নদী ও সাগরের পানিরাশিকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে; যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, উপদ্রুত এলাকার মানুষ আবার নতুন করে জীবন শুরু করেছে। কিন্তু খাদ্যের অভাব, জীবিকার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। কিছুটা  সচ্ছল পরিবারগুলো ঘরবাড়ি মেরামত করতে পেরেছে। দরিদ্র পরিবারগুলো এখনো পুরোপুরি মেরামত করতে পারেনি। সরকারের পক্ষ থেকে টিনসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কেউ কেউ তা পেলেও অনেকেই তা পায়নি। কোনোমতে মাথা গোঁজার চেষ্টা করছে তারা। এদিকে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। সড়ক-মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন এবং এ কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যা মানুষের জীবনে নতুন ভোগান্তির সূত্রপাত ঘটিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়েছে আসবাব। সেগুলো ঠিক করতে হবে। শিশুরা স্কুলে ফিরেছে। কিন্তু অনেকের বইপত্র বন্যার পানিতে তলিয়ে  গিয়েছিল। তাদের শিক্ষা উপকরণ জোগাতে হবে। অবকাঠামো সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন আমন মৌসুম। কৃষক আমন রোপণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু আর্থিক সংগতির অভাবে তারা বীজ, সার ও অন্য কৃষি উপকরণ কিনতে পারছেন না। তাদের সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি উপকরণ পৌঁছে দিতে হবে। সর্বোপরি, উপদ্রুত এলাকার মানুষের কষ্ট লাঘবে সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের শুধু অস্থায়ী কিছু ব্যবস্থা নেয়ার প্রতি নজর দেয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া হয়-ই না বলা চলে। এ প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ড ও অদূরদর্শিতার ফলে আমাদের খরস্রোতা নদীগুলো আজ জীর্ণ-শীর্ণ। নদীগুলোকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষায় সঠিক নিয়মে ড্রেজিং করতে হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ব্যাপারে আমাদের অবস্থান ও দাবি আরো জোরালো করতে হবে। নিতে হবে দৃঢ় কূটনৈতিক ভূমিকা। আমাদের উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর উৎস দেশের ভূসীমানার বাইরে। এটা মাথায় রেখে আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার বিরূপতায় সামনে বাংলাদেশে বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পৌনঃপুনিকতা এবং ভয়াবহতা আরো বাড়বে। সাম্প্রতিক বন্যা তারই ইঙ্গিতবাহী। এটা আমলে নিয়ে সরকারের এখন থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের আয়ত্তের বাইরে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখন রংপুরে বন্যা চলছে। বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তার সংস্থানে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধপত্র ও চিকিৎসাসেবাও নিশ্চিত করতে হবে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। এটা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। ক্ষয়ক্ষতি ও ভয়াবহতা প্রশমনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত ও চৌকস করে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কর্মপরিকল্পনা এবং টেকসই ব্যবস্থা প্রয়োজন। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বন্যা মোকাবেলায় আমাদের সর্বাত্মকভাবে সুসজ্জিত হওয়াটাই এখন সময়ের দাবি।