সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার একই মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। ‘এক দেশ এক রেট’ নামে নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ৫ এমবিপিএস ইন্টারনেটের জন্য গ্রাহককে মাসিক ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। আর ১০ এমবিপিএসের জন্য ৮০০ টাকা এবং ২০ এমবিপিএসের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হবে। জুলাই থেকে এ নতুন রেট কার্যকর হবে। আশা করা যাচ্ছে, এর ফলে গ্রাম থেকে শহর, সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল্য একই হবে। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম এগিয়ে থাকা অঞ্চলের চেয়ে বেশি হওয়া নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল এতদিন। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিষয়টির পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে আশা করা যায়। এতে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মানুষরা স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট সেবা পাবে। প্রয়োজন সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন। আর এজন্য প্রয়োজন হবে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা ও নির্দেশনা ভঙ্গকারীদের শাস্তি প্রদান। একই সঙ্গে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রণোদনা দিতে হবে।
দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসার ও বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ: ভিশন-২০২১’ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই কাঙ্ক্ষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়তে হলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারের যে কোনো বিকল্প নেই, বিষয়টি সবার জানা। সবার মাঝে কম খরচে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা দিতে সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে বলে খবর মিলছে। বলা হচ্ছে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর পরিধি বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ অল্প খরচে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা পাবে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো হচ্ছে, দামও কমানো হচ্ছে কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে আসলে সে সুবিধা পৌঁছাচ্ছে খুবই অল্প হারে। উপরন্তু গ্রাহকের ভোগান্তির শেষ নেই। এবার যেন তেমনটি না ঘটে, সেজন্য তদারকি জোরদার করা চাই। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ খুবই ছোট, মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইল। এ পরিমাণ জায়গায় ভালো মানের ইন্টারনেট সংযোগ দিতে বিনিয়োগের পরিমাণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম দরকার। সম্প্রতি বিটিআরসি একটি ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা সেলফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ পরিমাপ করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষা শুরু করেছে। একইভাবে ব্রডব্যান্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান নির্ধারণ এবং সবাই সেটি মানছে কিনা, তা তদারকির উদ্যোগও বিটিআরসি নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
ভারতে মোবাইল ডাটার দাম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে অনেক অপশন আছে, ফলে ইন্টারনেট প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে ভারত ক্রমে বিশ্বের আউটসোর্সিংয়ের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ভারত সরকার ফিক্সড লাইন ব্রডব্যান্ড পরিষেবার জন্য প্রযোজ্য লাইসেন্স ফি কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলেও খবর মিলেছিল, এতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম আরো সস্তা হয়ে উঠবে। সরকারের এ পদক্ষেপ নেয়ায় সুবিধা হবে যে দেশীয় ব্রডব্যান্ড সংস্থাগুলোকে লাইসেন্স ফি দিতে হবে না। ফলে সংস্থাগুলো সস্তা ইন্টারনেট সরবরাহ করবে এবং তাদের পরিষেবাগুলো প্রসারিত করতে পারবে। বাংলাদেশও ভারতের নীতি অনুসরণ করতে পারে। অধিক দামের ইন্টারনেট এবং দাম অনুযায়ী সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভও আছে সাধারণ জনগণের মধ্যে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দিক থেকেও এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। অধিকাংশ কাজ ইন্টারনেটে করা যায়। মানুষ এখন এতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
দেশের আইসিটি শিল্পের দ্রুত বিকাশ এবং দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবার খরচ সাশ্রয়ী, সেবাবান্ধব ও সহজলভ্য করতে হবে। বিপরীতে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে ইন্টারনেট সেবা স্বল্প দামে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবার নির্ধারিত কোনো ট্যারিফ না থাকায় শহর ও গ্রামের সেবার মান ও মূল্যে বিস্তর তফাত রয়েছে। বর্তমান সিদ্ধান্তের প্রতিফলন যেন গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্বও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সেবার সুফল পেতে হলে গ্রাহক পর্যায়ে ভালো গতি এবং স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধার কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সরকার পুরনো আমলের অনেক কিছু পরিবর্তন করেছে। গ্রামেও শহরের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বানাতে পারেন আগামীর তরুণরা। তাদের ইন্টারনেটের প্রতি সুষ্ঠু-সুন্দর জ্ঞান আমাদের অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলবে। বিশ্ব ভাবছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে। আমরা এখনো আগের জায়গায় পড়ে আছি অনেকাংশে। বাংলাদেশের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ শিক্ষার্থী। তাদের অনেকেই এই মধ্যবিত্ত সমাজে বিভিন্ন চাকরি, টিউশন করে অথবা মা-বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে হাতখরচ চালায়। সেই হাতখরচের একটি বিরাট অংশ ব্যয় হয় ইন্টারনেটের পেছনে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কম থাকায় সেলফোন সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলো একচেটিয়া বাণিজ্য করে যাচ্ছে অনেকটা সময় ধরে। বাংলদেশের মানুষের আয়ের পরিমাণ হয়তো বেড়েছে কিন্তু সেই তুলনায় খরচও বেড়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে নির্ভর করতে হয় উচ্চমূল্যের প্যাকেজের ওপর, যা বাংলাদেশ ডিজিটাল হওয়ার পথে বড় বাধা। আশা করা যায়, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সুফল মিলবে। তবে এজন্য তৃর্ণমূল পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে।










